ইতালিতে বিক্ষোভের আগুন, সংঘর্ষ-লুটপাটে ব্রিটিশ পর্যটকদের জন্য সতর্কবার্তা বহাল
ইতালির বিভিন্ন শহরে সহিংস বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনায় পর্যটকদের সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্য, বহাল রেখেছে ভ্রমণসংক্রান্ত নিরাপত্তা নির্দেশনা।
ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র ইতালিতে সহিংস বিক্ষোভ ও লুটপাটের ঘটনায় ভ্রমণকারীদের জন্য সতর্কতা বহাল রেখেছে যুক্তরাজ্য। দেশটির বিভিন্ন শহরে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ায় ব্রিটিশ পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ইতালির কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি এবং লুটপাটের ঘটনার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র, কমনওয়েলথ ও উন্নয়ন দপ্তর ৩ নভেম্বর ২০২৬ ইতালিতে ভ্রমণসংক্রান্ত নির্দেশনা হালনাগাদ করেছে। নতুন নির্দেশনায় জাতীয় ধর্মঘটসংক্রান্ত আগের তথ্য সরিয়ে নেওয়া হলেও সহিংস বিক্ষোভ ও লুটপাটের বিষয়ে সতর্কবার্তা বহাল রাখা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, উত্তর ইতালির বিভিন্ন শহরে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ সহিংস সংঘর্ষ ও লুটপাটে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে মিলানে পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। বড় শহরগুলোতে নতুন করে বিক্ষোভ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইতালির রোম, মিলান, নেপলস, তুরিন ও বোলোনিয়াসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এসব কর্মসূচির মধ্যে কয়েকটি সহিংস রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
গত অক্টোবরের শেষ দিকে ইতালিতে বিক্ষোভের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, বেতন বৃদ্ধি না পাওয়া এবং সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেয়।
রাজধানী রোমে বিক্ষোভের সময় ঐতিহাসিক কলোসিয়াম এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়। শুক্রবার সেখানে প্রায় ২০ হাজার বিক্ষোভকারী অংশ নেন বলে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কলোসিয়ামের কাছাকাছি সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয়। সার্কাস ম্যাক্সিমাস এলাকায় একটি সামরিক প্রদর্শনীকে ঘিরেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
মিলানেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শহরটির বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি সামরিক সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। বিক্ষোভের সময় সড়কে অস্থিরতা এবং বিভিন্ন স্থানে সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তুরিন শহরেও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন আন্দোলনকারী সংগঠনের সদস্যরা প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করতে হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ইতালির ভিসেনজা শহরে সংঘর্ষে অন্তত তিনজন আহত হওয়ার খবর প্রকাশ করেছে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। আহতদের মধ্যে একজনের মাথায় পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের গোলা আঘাত করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার বিক্ষোভের কারণে জননিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। অক্টোবর মাসে ঘোষিত প্রস্তাবিত ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত বিক্ষোভকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থাকার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানার বিধানের কথা উঠে এসেছে। তবে এসব পদক্ষেপ নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বিতর্ক রয়েছে।
বিক্ষোভের প্রভাব শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গণপরিবহন, রেল যোগাযোগ, বিমান চলাচল এবং সড়কপথেও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো এলাকায় হঠাৎ বিক্ষোভ শুরু হলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ কিংবা নিরাপত্তাজনিত কারণে পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটতে পারে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর ইতালিতে অবস্থানরত এবং দেশটিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করা পর্যটকদের বিক্ষোভ, রাজনৈতিক সমাবেশ ও মিছিল থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। কোনো বিক্ষোভের কাছাকাছি অবস্থান করলে পুলিশের নির্দেশনা অনুসরণ করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। সংঘর্ষ বা পুলিশের কার্যক্রম দেখতে কিংবা ছবি তুলতে ঘটনাস্থলে অবস্থান না করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং সরকারি ভ্রমণ নির্দেশনা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। ভ্রমণের আগে বিমান সংস্থা, রেল কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য পরিবহন সেবাদাতার কাছ থেকে যাত্রার সর্বশেষ তথ্য জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসা, যাতায়াত কিংবা অন্যান্য খরচের কথা বিবেচনা করে উপযুক্ত ভ্রমণবিমা রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে যুক্তরাজ্যের এই সতর্কবার্তার অর্থ এই নয় যে ইতালিতে ভ্রমণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেশটির সরকার ব্রিটিশ নাগরিকদের ইতালি ভ্রমণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়নি। বরং নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে। অর্থাৎ পর্যটকেরা ইতালি ভ্রমণ করতে পারবেন, তবে পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
ইতালি ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। রোমের ঐতিহাসিক স্থাপনা, ভেনিসের খাল, মিলানের বাণিজ্যিক এলাকা এবং ফ্লোরেন্সের ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকেরা সেখানে যান। সাম্প্রতিক অস্থিরতা দেশটির পর্যটন খাতে উদ্বেগ তৈরি করলেও সব পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক বিক্ষোভের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে নির্দিষ্ট শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে বড় সমাবেশ, সরকারি ভবন, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্থাপনা এবং বিক্ষোভের স্থান এড়িয়ে চলা উচিত। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চললে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ইতালিতে সহিংস বিক্ষোভ ও লুটপাটের ঘটনায় যুক্তরাজ্য ভ্রমণ সতর্কতা বহাল রেখেছে। জাতীয় ধর্মঘটসংক্রান্ত তথ্য সরিয়ে নেওয়া হলেও সহিংসতার আশঙ্কা নিয়ে সতর্কবার্তা অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে ইতালিতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।