ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলায় নিহত ৩১ জন, এখনো নিখোঁজ প্রায় ৫০ জন
ইউক্রেনের একটি স্কুলে স্থাপিত মানবিক সহায়তা কেন্দ্রে রুশ হামলায় প্রাণ গেছে ৩১ জনের। ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের খুঁজতে উদ্ধার অভিযান চলছে।
ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩১ জনে দাঁড়িয়েছে। ২ নভেম্বর সোমবার কোমিশুভাখা গ্রামের একটি স্কুল ভবন ও পাশের আশ্রয়কেন্দ্রে এই হামলা চালানো হয়। ভবনটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া এবং আশ্রয় নেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল। হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ মানুষদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। এখনো প্রায় ৫০ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক কর্মকর্তারা।
প্রথম দিকে হামলায় ১৮ জন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। পরে উদ্ধার অভিযান ও হতাহতের সংখ্যা হালনাগাদ করার পর তা বেড়ে ৩১ জনে পৌঁছায়। মঙ্গলবার এ তথ্য জানান জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত সামরিক প্রশাসনপ্রধান মিখাইলো সেমিকিন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে চারজন পুলিশ সদস্য এবং দুজন উদ্ধারকর্মী রয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা। আহতদের মধ্যে উদ্ধারকর্মীও রয়েছেন। হামলার পর থেকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে কাজ চলছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কোমিশুভাখা গ্রামের স্কুল ভবনটিতে নিয়মিত পাঠদান চলত না। যুদ্ধের কারণে এলাকাটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠায় সেখানে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য ভবনটি মানবিক সহায়তা বিতরণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রতি সপ্তাহের সোমবার সেখানে খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে জড়ো হতেন আশপাশের বাসিন্দারা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, রুশ বাহিনী প্রথমে স্কুল ভবনটিতে কয়েকটি বিমান হামলা চালায়। এরপর আশ্রয় নেওয়া মানুষদের অবস্থান করা জায়গায় আরও নয়টি বোমা ফেলা হয়। এতে ভবনের বিভিন্ন অংশ ধসে পড়ে এবং বহু মানুষ হতাহত হন। হামলার পর ঘটনাস্থলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়।
উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। তবে আশপাশে নতুন করে হামলার আশঙ্কা এবং নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজদের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত তল্লাশি চালানো হবে।
এই হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মানুষ যখন খাবার ও মানবিক সহায়তা নিতে সেখানে জড়ো হয়েছিলেন, তখনই তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি ঘটনাটিকে বেসামরিক মানুষের ওপর ভয়াবহ আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে, হামলার বিষয়ে রাশিয়ার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ফলে হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে দুই পক্ষের কোনো পাল্টাপাল্টি আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়।
এদিকে ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রাতভর রুশ হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় শত শত ড্রোন ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাসপাতাল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। খারকিভ অঞ্চলেও বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধের জন্য নতুন করে আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে এই আলোচনা হওয়ার কথা।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সহযোগী ভ্লাদিমির মেদিনস্কি দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। অন্যদিকে ইউক্রেনও আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধ, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার বিষয়ে কতটা অগ্রগতি হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
একদিকে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, অন্যদিকে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা—সব মিলিয়ে ইউক্রেনের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। কোমিশুভাখা গ্রামের হামলায় নিখোঁজদের উদ্ধার এবং আহতদের চিকিৎসা এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর রয়েছে আবুধাবির সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার দিকে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।