অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের মনোনয়ন জিতে আলোচনায় আবদুল এল-সায়েদ, সমর্থকদের অভিনন্দনে উচ্ছ্বাস
মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক মনোনয়ন জয়ের পর আবদুল এল-সায়েদকে ঘিরে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, অভিনন্দন ও ভালোবাসায় জমে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রগতিশীল রাজনীতিক আবদুল এল-সায়েদ। দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে জয়লাভ করে সিনেট নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাওয়ার পর তাঁকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। কেউ তাঁকে নিজেদের পছন্দের রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরছেন, আবার কেউ তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতির প্রশংসা করছেন।
আবদুল এল-সায়েদ একজন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রাজনীতিক। তাঁর জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে। তাঁর পারিবারিক শিকড় মিশরে। তিনি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন। চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য খাতে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।
রাজনীতিতে আসার আগে তিনি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করেছেন। ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য ও মানবিক সেবা বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসার ব্যয় এবং সামাজিক বৈষম্য সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
২০২৬ সালের ৪ আগস্ট মিশিগানে অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাথমিক নির্বাচনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স। নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। শেষ পর্যন্ত সরকারি ফলাফলে আবদুল এল-সায়েদ ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫২ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে হ্যালি স্টিভেন্স পান ৭ লাখ ৩১ হাজার ১৬০ ভোট, যা মোট ভোটের ৪৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ। তৃতীয় প্রার্থী ম্যালরি ম্যাকমরো পান ৪ শতাংশ ভোট।
এই ফলাফলকে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। কারণ, দলটির প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে আবদুল এল-সায়েদ মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। তাঁর এই জয় প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার সমর্থকদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে।
প্রচারণায় আবদুল এল-সায়েদের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা। তিনি মনে করেন, অর্থের অভাবে কোনো নাগরিকের চিকিৎসা বন্ধ থাকা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে তিনি সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এ ছাড়া ধনী ব্যক্তিদের ন্যায্য কর প্রদান, বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া প্রভাব কমানো, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর নির্বাচনী বক্তব্যে কর্মজীবী মানুষ, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার এবং তরুণদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও তাঁর অবস্থান বেশ আলোচিত। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে তিনি সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিদেশের সংঘাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন ও সামাজিক উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এ অবস্থান তাঁকে প্রগতিশীল ভোটারদের একটি অংশের কাছে জনপ্রিয় করেছে। তবে তাঁর এসব বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
প্রাথমিক নির্বাচনে জয়ের পর তাঁর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতির পরিচিত ব্যক্তিত্ব বার্নি স্যান্ডার্স এবং আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ। তাঁদের সমর্থন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার ও পরিবর্তনকামী মানুষের কাছে তাঁর রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে এসব সমর্থন সহায়ক হয়েছে।
প্রাথমিক নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর হ্যালি স্টিভেন্স প্রথমদিকে আবদুল এল-সায়েদকে সমর্থনের কথা জানিয়েছিলেন। তবে সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁর অবস্থানে পরিবর্তন আসে। তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানান। এতে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি নতুন করে প্রকাশ্যে আসে। বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
অন্যদিকে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী মাইক রজার্স ছিলেন সাবেক কংগ্রেস সদস্য ও সাবেক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা। তাঁর সঙ্গে আবদুল এল-সায়েদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মিশিগানের সিনেট নির্বাচনকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে পরিণত করে। দুই প্রার্থীই অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক নীতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন।
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে মিশিগানের এই আসনটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। কারণ, সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লড়াইয়ে আসনটি ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়। তবে ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগে কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা সঠিক নয়।
আবদুল এল-সায়েদ নির্বাচনে জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে তাঁর নির্বাচনী লড়াই শুধু মিশিগানের রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বমূলক রাজনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ঘিরে অভিনন্দন ও ভালোবাসার বার্তা তাঁর সমর্থকদের আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াকে নির্বাচনী ফলাফল বা পুরো জনগোষ্ঠীর মতামত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
চিকিৎসক থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা আবদুল এল-সায়েদের রাজনৈতিক যাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতিতে নতুন আলোচনার সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিক নির্বাচনে তাঁর জয় ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। তবে সাধারণ নির্বাচনে তাঁর চূড়ান্ত অবস্থান জানতে আনুষ্ঠানিক ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে হবে। সমর্থকদের অভিনন্দন ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা নতুন করে আলোচনায় এলেও নির্বাচনী বিজয়ের চূড়ান্ত স্বীকৃতিই হবে তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক অধ্যায়ের নির্ধারক।

অবৈধ ভোটের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে চার বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার, তদন্ত তিন রাজ্যে

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিয়ে গণতন্ত্রের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করলেন সাবরিনা চৌধুরী

নিউ জার্সির তিন আসনে ভোটের লড়াই, বড় চমকে পিছিয়ে পড়ল রিপাবলিকানরা





মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।