বেতন বাড়ার আশায় পোশাকশ্রমিকরা, নতুন মজুরি নির্ধারণে আজ বসছে বিশেষ বোর্ডের প্রথম সভা
গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে আজ বসছে মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা, ন্যায্য বেতন নিয়ে বাড়ছে শ্রমিকদের প্রত্যাশা।
ঢাকা: দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মচারীদের নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের লক্ষ্যে গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা আজ বুধবার (৪ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বেলা ১১টায় ঢাকায় বোর্ডের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা জজের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং ন্যায্য মজুরির দাবিকে কেন্দ্র করে আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গার্মেন্টস শিল্প খাতে নিয়োজিত সকল শ্রেণির শ্রমিক ও কর্মচারীর নিম্নতম মজুরি হারের সুপারিশ করার জন্য বোর্ডের প্রথম সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভায় নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ১ নভেম্বর সরকার তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করে। শ্রমিক, মালিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বোর্ডটি গঠন করা হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরির সুপারিশ তৈরি করা যায়।
বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শেখ আশফাকুর রহমান। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পরিচালক এবিএম সামছুদ্দিন এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব।
অন্যদিকে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন। ফলে বোর্ডে শ্রমিক, মালিক ও নিরপেক্ষ পক্ষের প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়েছে।
বর্তমান মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এই মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। এরপর থেকে দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নতুন করে মজুরি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলে বাসাভাড়া, খাবার, বিদ্যুৎ, পানি, চিকিৎসা এবং যাতায়াতের ব্যয় বেড়েছে। ফলে মাসিক আয় দিয়ে পরিবার পরিচালনা করা অনেক শ্রমিকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
শ্রমিক প্রতিনিধিদের প্রত্যাশা, নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বাস্তব জীবনযাত্রার ব্যয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তাঁদের মতে, শুধু খাদ্যদ্রব্যের মূল্য নয়, বাসস্থান, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা এবং পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচও বিবেচনায় নিতে হবে।
অন্যদিকে পোশাকশিল্পের মালিকদেরও উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, ক্রয়াদেশ, রপ্তানি আয় এবং কারখানার আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও জরুরি। মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, খাদ্য ও বাসস্থানের খরচ, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে পোশাকশ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৯৪ সালে এই খাতে প্রথম নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ৯৩০ টাকা। পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালে ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা, ২০১০ সালে ৩ হাজার টাকা, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০ টাকা, ২০১৮ সালে ৮ হাজার টাকা এবং ২০২৩ সালে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
শ্রমিকদের দাবি, নতুন মজুরি যেন বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা না থাকে। একই সঙ্গে নির্ধারিত বেতন নিয়মিত পরিশোধ, অতিরিক্ত কাজের যথাযথ পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে আজকের প্রথম সভাতেই নতুন মজুরির পরিমাণ চূড়ান্ত হওয়ার কথা নয়। সভার মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। পরবর্তী সময়ে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মতামত, সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত এবং বোর্ডের আলোচনার ভিত্তিতে সুপারিশ তৈরি করা হবে। নতুন মজুরি কত টাকা হবে এবং কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
নতুন মজুরি বোর্ডের প্রথম সভাকে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন শ্রমিক, মালিক ও সংশ্লিষ্ট সবার নজর বোর্ডের পরবর্তী কার্যক্রম এবং নতুন মজুরি নির্ধারণের সিদ্ধান্তের দিকে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।