প্রথম ম্যারাথনেই মর্মান্তিক মৃত্যু, শেষ রেখার আগেই থেমে গেল ২৪ বছরের তরুণীর জীবন
নিউইয়র্ক ম্যারাথনে প্রথমবার অংশ নিয়ে শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারালেন তরুণী র্যাচেল আপা, শোকস্তব্ধ পরিবার, বন্ধু ও ক্রীড়াঙ্গন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে অনুষ্ঠিত বিখ্যাত নিউইয়র্ক ম্যারাথনে অংশ নিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন ২৪ বছর বয়সী তরুণী র্যাচেল আপা। জীবনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ম্যারাথনে অংশ নিতে কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ২৬ দশমিক ২ মাইলের দীর্ঘ দৌড় শেষ করার প্রায় দুই মাইল আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে যান এই তরুণী। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
ঘটনাটি ঘটে গত ১ নভেম্বর, রোববার। র্যাচেলের বাড়ি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের লুইসবারি এলাকায়। নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কের কাছে ম্যারাথনের প্রায় ২৪ মাইল অতিক্রম করার সময় তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন দৌড়ের শেষ গন্তব্য থেকে তাঁর দূরত্ব ছিল মাত্র দুই মাইলের কিছু বেশি।
নিউইয়র্ক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে ম্যারাথনের ২৪ মাইল চিহ্নের কাছে ২৪ বছর বয়সী এক নারীকে গুরুতর শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত অবস্থায় দেখতে পান দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা। পরে জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে মাউন্ট সিনাই হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল।
ঘটনার পরপরই আশপাশে থাকা কয়েকজন দর্শক ও পথচারী তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসকও ছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাঁরা দ্রুত হৃদ্যন্ত্র সচল করার জরুরি প্রক্রিয়া শুরু করেন। পরে ম্যারাথনের চিকিৎসাকর্মীরা এসে সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। এরপর জরুরি চিকিৎসা দল তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
র্যাচেলের বাবা স্টিভ আপা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসকেরা দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর মেয়েকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ৯টা ৪০ মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয়।
র্যাচেলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার, বন্ধু, সাবেক সতীর্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের দৌড় ও হকি অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে।
এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, র্যাচেল শুধু নিজের শখ পূরণের জন্য ম্যারাথনে অংশ নেননি। তিনি তাঁর প্রয়াত দাদার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং পারকিনসন রোগ নিয়ে সচেতনতা ও গবেষণায় সহায়তা করতে দৌড়েছিলেন।
তাঁর দাদা পারকিনসন রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং ২০২২ সালে মারা যান। দাদার স্মৃতিকে সম্মান জানাতে তিনি পারকিনসনস ফাউন্ডেশনের অর্থ সংগ্রহ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই ম্যারাথনে নাম লেখান।
নিজের অর্থ সংগ্রহের পাতায় র্যাচেল জানিয়েছিলেন, তাঁর দাদা ছোটবেলা থেকেই তাঁকে সক্রিয় থাকতে, নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে এবং নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে উৎসাহিত করতেন। দাদার অসুস্থতার কারণে চলাফেরার স্বাধীনতা কীভাবে ধীরে ধীরে কমে যায়, সেটিও তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করে।
র্যাচেলের অর্থ সংগ্রহের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল চার হাজার মার্কিন ডলার। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর অসংখ্য মানুষ তাঁর উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়ে অর্থ সহায়তা করেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ জমা পড়ে।
র্যাচেল ছিলেন একজন মেধাবী শিক্ষার্থী এবং সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের খেলোয়াড়। তিনি বাকনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী হকি দলের হয়ে চার বছর খেলেছেন। ২০২৪ সালে স্নাতক সম্পন্ন করার আগে বিশ্ববিদ্যালয়টির হয়ে মোট ৬৩টি খেলায় অংশ নেন। এর মধ্যে ৪২টি খেলায় মূল দলে ছিলেন। তাঁর অর্জনের মধ্যে ছিল ১৭টি গোল ও ছয়টি সহায়তা।
পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে পণ্য ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছিলেন। পাশাপাশি দক্ষিণ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর পড়াশোনাও শুরু করেছিলেন। চাকরি, পড়াশোনা ও খেলাধুলার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে ম্যারাথনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
ম্যারাথনের দিন বাবার সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। স্টিভ আপা বাড়িতে বসে দৌড়ের অগ্রগতি অনুসরণ করছিলেন। বিভিন্ন পর্যায়ে মেয়ের সঙ্গে তাঁর বার্তা বিনিময় হচ্ছিল। দৌড়ের প্রায় নয় মাইল অতিক্রম করার পর র্যাচেল বাবাকে জানিয়েছিলেন, তাঁর শরীর ভালো লাগছে এবং তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে দৌড়াচ্ছেন।
তবে দৌড় যত এগোতে থাকে, ততই তাঁর শরীরে ব্যথার অনুভূতি বাড়তে থাকে। বাবাকে পাঠানো বার্তায় তিনি ব্যথার কথা জানান। বাবা তাঁকে গতি কমিয়ে নিরাপদে দৌড় শেষ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ২৪ মাইলের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর তাঁর অবস্থান অনুসরণকারী ব্যবস্থায় আর কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছিল না। এরপরই পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে।
র্যাচেলের মা মিশেল আপা এবং তাঁর কয়েকজন বন্ধু সেদিন নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে তাঁকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। মেয়ের অবস্থান থেমে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে তাঁর মা ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। সেখানে পৌঁছে জানতে পারেন, জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা ইতিমধ্যে র্যাচেলকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন।
র্যাচেলের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাঁর বাবা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, চিকিৎসকেরা তাঁকে র্যাবডোমায়োলাইসিস নামের বিরল ও বিপজ্জনক শারীরিক সমস্যার কথা বলেছেন। এ অবস্থায় পেশির কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেঙে যেতে পারে এবং সেখান থেকে নির্গত উপাদান রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম, পেশিতে আঘাত, পানিশূন্যতা এবং অতিরিক্ত তাপের মতো বিষয় এই সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে র্যাচেলের মৃত্যুর বিষয়ে নিউইয়র্কের প্রধান চিকিৎসা পরীক্ষকের কার্যালয় তদন্তের কথা জানিয়েছে। তাই ময়নাতদন্ত ও আনুষ্ঠানিক তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগে এই রোগকেই নিশ্চিত মৃত্যুর কারণ বলা যাচ্ছে না।
ম্যারাথন আয়োজনকারী নিউইয়র্ক রোড রানার্স কর্তৃপক্ষ র্যাচেলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। পরিবার, বন্ধু এবং দৌড়প্রেমীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তারা বলেছে, এই মৃত্যু পুরো দৌড় সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
বাকনেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের হকি সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোও তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে। তাঁদের বক্তব্যে র্যাচেলের ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদান, নিষ্ঠা এবং সতীর্থদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে।
এদিকে ২০২৬ সালের নিউইয়র্ক ম্যারাথন ছিল পাঁচটি বরো নিয়ে আয়োজিত প্রতিযোগিতার ৫০তম আসর। এবারের প্রতিযোগিতায় রেকর্ডসংখ্যক ৬১ হাজারের বেশি দৌড়বিদ দৌড় শেষ করেছেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
একটি স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন র্যাচেল। তাঁর লক্ষ্য ছিল দৌড় শেষ করা, প্রয়াত দাদার স্মৃতিকে সম্মান জানানো এবং একটি মানবিক উদ্যোগে অবদান রাখা। কিন্তু শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই থেমে গেল তাঁর জীবনযাত্রা। তাঁর এই মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, দীর্ঘ সময়ের কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষেত্রে শরীরের সংকেত, নিরাপত্তা এবং জরুরি চিকিৎসার গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।