ইলন মাস্কের স্ট্যানফোর্ডে এবার শিক্ষক বাংলাদেশের লাবিব, বিশ্বজুড়ে ছড়াচ্ছে তাঁর সাফল্যের গল্প
ইলন মাস্কের বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যানফোর্ডে শিক্ষকতা করছেন বাংলাদেশি লাবিব তাজওয়ার রহমান; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি গবেষণায় অর্জন করছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বিশ্বের অন্যতম নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় স্ট্যানফোর্ডে পড়াশোনা করেছেন ইলন মাস্ক। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গুগলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিনের নাম। গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাইও এখান থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। এবার সেই বিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করছেন বাংলাদেশের তরুণ লাবিব তাজওয়ার রহমান। শুধু শিক্ষকতা নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা, প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা এবং আধুনিক রোবট প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও কাজ করছেন তিনি। ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর এই গল্প শুধু একজন তরুণের সাফল্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও গর্বের।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, লাবিব বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রকৌশল অনুষদের সহযোগী প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি স্ট্যানফোর্ড থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৃহৎ পরিসরের অবকাঠামো নিয়ে পাঠদান করছেন।
এই পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার ব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র, উন্নত যন্ত্রপাতি, তথ্য সংরক্ষণ এবং বৃহৎ পরিসরে প্রযুক্তি পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কীভাবে তৈরি ও পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দিচ্ছেন এই বাংলাদেশি তরুণ।
স্ট্যানফোর্ডের সঙ্গে প্রযুক্তি দুনিয়ার বহু পরিচিত ব্যক্তিত্বের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সময় গুগল প্রতিষ্ঠা করেন। ইলন মাস্কও সেখানে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন, যদিও তিনি ডিগ্রি সম্পন্ন করেননি। অন্যদিকে গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই স্ট্যানফোর্ড থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন বাংলাদেশির শিক্ষকতা দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার বিষয়।
লাবিবের সাফল্যের গল্প কেবল উচ্চশিক্ষা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। ২০১৫ সালে শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ইনক্লুশনএক্স নামের একটি উদ্যোগ। এর লক্ষ্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, স্নায়ুবৈচিত্র্যসম্পন্ন মানুষ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ব্যক্তিদের জন্য সহায়তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের গভীর বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। লাবিবের বড় ভাই অর্ণব সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত ছিলেন। ভাইয়ের অসুস্থতা এবং তাঁকে ঘিরে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছোটবেলা থেকেই লাবিবকে ভাবিয়েছে। ভাইয়ের মৃত্যুর পর বিদ্যালয়ে ফিরে এক সহপাঠীর কাছ থেকে ভাইকে নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য শুনেছিলেন তিনি। ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে আঘাত করে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পর্কে সমাজের ভুল ধারণা পরিবর্তনের ইচ্ছা থেকেই পরবর্তী সময়ে ইনক্লুশনএক্স প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেন।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিভিন্ন সহায়তামূলক কর্মসূচি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে কাজ করা হচ্ছে। লাবিবের লক্ষ্য কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন।
লাবিবের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়ে সম্মানজনক ভাষা ব্যবহারের নির্দেশিকা তৈরি করা। ২০১৯ সালে তিনি স্ট্যানফোর্ড প্রতিবন্ধিতা ভাষা নির্দেশিকা নামে একটি নির্দেশিকা রচনা করেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিচয়, মর্যাদা, অধিকার এবং তাঁদের বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে এতে। ব্যক্তিকে তাঁর প্রতিবন্ধিতার পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষ হিসেবে সম্মান করার বিষয়টিও এই নির্দেশিকার গুরুত্বপূর্ণ দিক।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবেও লাবিবের রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিচিতি। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় খাবার সরবরাহকারী রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিউবিলিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা তিনি। স্ট্যানফোর্ডে পড়াশোনার সময় বন্ধুদের সঙ্গে মিলে এই উদ্যোগ শুরু করেন। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি রোবট রেস্তোরাঁ থেকে গ্রাহকের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়।
ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় চলাচল প্রযুক্তির সাহায্যে এসব রোবট নির্দিষ্ট পথে চলতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য খাবার সরবরাহের খরচ কমানো এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা। ২০২৩ সালে নিউবিলিটির স্বয়ংক্রিয় সরবরাহকারী রোবট সিইএস উদ্ভাবন পুরস্কার অর্জন করে।
লাবিবের ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকাতেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। ২০২৩ সালে তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অসাধারণ অর্জন পুরস্কার লাভ করেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার, ভাষাগত অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও তাঁর সামাজিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
তবে লাবিবের সাম্প্রতিক কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো বাংলাদেশের স্নায়ুবৈচিত্র্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। স্ট্যানফোর্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এসব শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি গবেষণা প্রকল্পে তিনি যুক্ত রয়েছেন।
এই প্রকল্পের লক্ষ্য অটিজম, ডাউন সিনড্রোম এবং সেরিব্রাল পালসিসহ বিভিন্ন ধরনের স্নায়ুবিক বৈচিত্র্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য আরও ব্যক্তিনির্ভর শেখার পরিবেশ তৈরি করা। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থীর কথা বলার সক্ষমতা সীমিত অথবা পড়ার দক্ষতা কম, তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী ছবি, ভিডিও, লেখা ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত উপকরণ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকায় ইনক্লুশনএক্সের একটি কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়ে এই গবেষণা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে স্ট্যানফোর্ড। এর মাধ্যমে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য আরও সহজবোধ্য ও কার্যকর শিক্ষার পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও এই গবেষণার গুরুত্ব অনেক। দেশের বহু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিতে নিজেদের দক্ষতা প্রকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না। শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সক্ষমতা ও আগ্রহ অনুযায়ী পাঠদানের উপকরণ তৈরি করা গেলে তাদের শেখার সুযোগ বাড়তে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখানে শিক্ষককে সহায়তা করতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় পাঠের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
লাবিবের পথচলা দেখিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি অর্জনের পাশাপাশি নিজের দেশের মানুষের জন্য কাজ করাও একজন তরুণের বড় দায়িত্ব হতে পারে। ঢাকা থেকে স্ট্যানফোর্ড, সামাজিক উদ্যোগ থেকে রোবট নির্মাণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণা প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য তাঁর অর্জন শুধু গর্বের নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। মেধা, অধ্যবসায়, সঠিক লক্ষ্য এবং মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা থাকলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব। লাবিব তাজওয়ার রহমানের গল্প তাই একজন ব্যক্তির সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের সামর্থ্যেরও প্রতিচ্ছবি।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।