বিমানের অনিয়মে ক্ষুব্ধ সংসদীয় কমিটি, ৭৮৩ কোটি টাকার হিসাব চেয়ে কঠোর নির্দেশ দিলেন সদস্যরা
শৃঙ্খলা ফেরাতে বিমানে সংসদীয় কমিটির কঠোর বার্তা: ৪২ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি ৭৮৩ কোটি টাকার অডিট আপত্তি, ৩৪ এমপির ভোগান্তিতে তোলপাড়
জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সার্বিক বিশৃঙ্খলা, যাত্রী হয়রানি ও দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে এবার কঠোর অবস্থানে গেছে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি ১৯৮২-৮৩ অর্থবছর থেকে ঝুলে থাকা ৭৮৩ কোটি টাকার ১১১টি অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বেঁধে দেওয়া হয়েছে সময়সীমা।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে কমিটির ৬ষ্ঠ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে কমিটির সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, আখতারুজ্জামান মিয়া, খোন্দকার আবু আশফাক, কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, নাজিবুর রহমান ও কামাল হোসেন এমপি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) প্রতিনিধি এবং বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
৪২ বছরের অডিট জট: ৭৮৩ কোটি টাকা ঝুঁকিতে
বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল সিএজি কর্তৃক প্রণীত এবং সংসদে পেশকৃত বিমানের অডিট প্রতিবেদন। পর্যালোচনায় উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য বিমানের মোট ১১১টি অডিট আপত্তিতে আটকে আছে প্রায় ৭৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো আপত্তিটি ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরের, অর্থাৎ প্রায় ৪২ বছর আগের।
কমিটির এক সদস্য জানান, “একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ৪২ বছর আগের অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি না হওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক। এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার অভাবের চরম উদাহরণ।”
বৈঠকে বিমান কর্তৃপক্ষ দাবি করে, তারা আপত্তি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে এবং এর মধ্যে ১৩ কোটি টাকার আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে কমিটি যখন প্রমাণস্বরূপ নথি চায়, তখন বিমান কর্তৃপক্ষ কোনো দলিলপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়। ফলে কমিটি আগামী বৈঠকে বাধ্যতামূলকভাবে সকল নিষ্পত্তির প্রমাণপত্রসহ উপস্থিত থাকার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া টিকিট বিক্রির টাকা যথাযথভাবে কোষাগারে জমা না হওয়া এবং টিকিট বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
৩৪ এমপির লাগেজ ভোগান্তি: বিমানবন্দরে তুলকালাম
বৈঠকে সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত আলোচনা হয় গত ১ অক্টোবরের ঘটনা নিয়ে। ওইদিন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ৩৪ জন সংসদ সদস্য লাগেজ না পাওয়া, জমজমের পানি না পাওয়া এবং চরম যাত্রী হয়রানির শিকার হন।
ভুক্তভোগী এমপিরা এ বিষয়ে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও এক মাসেও কোনো জবাব দেয়নি বিমান। এতে বৈঠকে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সদস্যরা।
কমিটির সদস্য কামাল হোসেন এমপি বলেন, “যখন সংসদ সদস্যরা নিজেরাই বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হন, তখন সাধারণ যাত্রীদের অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। দীর্ঘ সময়েও অভিযোগের জবাব না দেওয়া দায়িত্বে চরম অবহেলার প্রমাণ।”
তীব্র সমালোচনার মুখে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রত্যেক অভিযোগকারী এমপিকে লিখিতভাবে জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
কমিটির ৩ দফা সুপারিশ
পরিস্থিতি উত্তরণে কমিটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে:
১. যাত্রী হয়রানি বন্ধে কঠোর নজরদারি: বিমানবন্দরে কোনো যাত্রী যাতে অবহেলা বা হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে সিসিটিভি মনিটরিং ও সারপ্রাইজ ভিজিট বাড়ানোর সুপারিশ।
২. আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানো: ৭৮৩ কোটি টাকার অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি করে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
৩. লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (বেবিচক) আরও দক্ষ, মিতব্যয়ী ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংসদীয় কমিটির এই কঠোর অবস্থান বিমানের দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার লাগাম টানতে সহায়ক হবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।