যুক্তরাষ্ট্রে বিরক্তি বাড়লে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবেন, মজা করে বললেন ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ফক্স নিউজে ট্রাম্প বলেন, আমেরিকানরা বিরক্ত হলে ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবেন এটি ছিল নিছক রাজনৈতিক রসিকতা।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি এমন একটি মন্তব্য করেছেন, যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ যদি কখনো তাঁর ওপর বিরক্ত হয়ে যায়, তাহলে তিনি ইসরায়েলে চলে যাবেন এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করবেন। তাঁর এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক রসিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে মন্তব্যটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
৩ নভেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ফক্স নিউজের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’-এ টেলিফোনে যুক্ত হন ট্রাম্প। সেখানে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে কথা বলেন এবং নিজের প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন। আলোচনার একপর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক প্রসঙ্গ সামনে আসে। তখনই নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি ইসরায়েলে চলে যাওয়ার মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েলে তাঁর জনপ্রিয়তার হার ৯৯ শতাংশ। তিনি দাবি করেন, দেশটির ইতিহাসে অন্য কারও এমন জনপ্রিয়তা ছিল না। এরপর তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ যদি কখনো তাঁর ওপর বিরক্ত হয়ে যায়, তাহলে তিনি ইসরায়েলে চলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবেন। বক্তব্যের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এটিকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ঘোষণা নয়, বরং রসিকতামূলক মন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে তাঁর করা ৯৯ শতাংশ জনপ্রিয়তার দাবিটি বিশেষভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কারণ, এই দাবির পক্ষে তিনি কোনো নির্দিষ্ট জরিপের নাম, জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় কিংবা তথ্য প্রকাশ করেননি। ফলে ইসরায়েলের জনগণের মধ্যে তাঁর প্রকৃত জনপ্রিয়তা ৯৯ শতাংশ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কোনো রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত দাবি এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত জনমত জরিপ এক বিষয় নয়।
এর আগেও একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। ২০২৬ সালের ২০ মে যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলরক্ষী বাহিনীর একটি অনুষ্ঠানের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে রসিকতা করেছিলেন। তখনো তিনি ইসরায়েলে নিজের জনপ্রিয়তা ৯৯ শতাংশ বলে দাবি করেন। অর্থাৎ নভেম্বরের বক্তব্যটি তাঁর পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা নয়। বরং কয়েক মাস আগে করা মন্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি।
এই মন্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, সামরিক সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতের সময় দুই দেশের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রশংসা করেন। একই আলোচনায় তিনি ইসরায়েলকে প্রতিবছর দেওয়া প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করার পরিকল্পনার কথাও জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৭ সাল থেকে ইসরায়েলের আর এই অর্থের প্রয়োজন হবে না। তবে এ বিষয়ে বাস্তবায়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা এবং বিদ্যমান চুক্তির পরিবর্তন কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে স্বাক্ষরিত দশ বছর মেয়াদি সামরিক সহায়তা সমঝোতায় ২০১৯ থেকে ২০২৮ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল। সাধারণ হিসাবে এর পরিমাণ বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে ট্রাম্পের ঘোষণার সঙ্গে বিদ্যমান সমঝোতার সম্পর্ক কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে ইসরায়েলের বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মন্তব্যের বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, দেশটির প্রধানমন্ত্রীকে পার্লামেন্টের সদস্য হতে হয়। পার্লামেন্টের সদস্য হওয়ার জন্য ইসরায়েলের নাগরিকত্বসহ নির্দিষ্ট আইনি যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। শুধু দেশটিতে বসবাস শুরু করলেই কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না। নির্বাচনী প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক দল এবং পার্লামেন্টের সমর্থনের মধ্য দিয়েই সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হয়।
ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য পার্লামেন্টের আস্থা অর্জন করাও অপরিহার্য। তাই ট্রাম্পের মন্তব্যকে বাস্তব রাজনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে গ্রহণ করার কোনো ভিত্তি নেই। তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, এমন কোনো তথ্যও প্রকাশিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্পের এই মন্তব্য বিশেষ সময়ে এসেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা, ক্ষমতাসীন দলের অবস্থান এবং কংগ্রেসে রাজনৈতিক ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নির্বাচনের দিন ট্রাম্প রিপাবলিকানদের পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি নিজের প্রশাসনের সাফল্য তুলে ধরেছেন। একই সময়ে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, ইরান নীতি এবং ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তার বিষয়গুলোও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
তাঁর বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থক ও সমালোচকদের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ মন্তব্যটিকে নিছক হাস্যরস হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিচিত ধরন বলে মনে করছেন। বিশেষ করে বিদেশে নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে তাঁর অতিরঞ্জিত দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
ট্রাম্পের ইসরায়েলে চলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বক্তব্যটি বাস্তব কোনো রাজনৈতিক ঘোষণা নয়। এটি নির্বাচনের দিন দেওয়া একটি রসিকতামূলক মন্তব্য। তবে এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক, সামরিক সহায়তা, ইরান পরিস্থিতি এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর ৯৯ শতাংশ জনপ্রিয়তার দাবির স্বাধীন প্রমাণ না থাকায় সেটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার করাও ঠিক হবে না।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।