অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট গণনা শুরু, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হতে শুরু করেছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে চলছে তীব্র লড়াই।
৯,৬৫৮ বার পড়া হয়েছে ৭ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হতে শুরু করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে তাঁর সরকারের জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে ব্যাপক আগ্রহ।
মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে ইন্ডিয়ানা ও কেন্টাকির কিছু এলাকায় প্রথম ভোটকেন্দ্র বন্ধ হতে শুরু করে। এরপর সন্ধ্যা ৭টায় জর্জিয়া, সাউথ ক্যারোলাইনা, ভারমন্ট ও ভার্জিনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে একই সময়ে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হয় না। সময় অঞ্চল ও স্থানীয় নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম দফায় ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর থেকেই নির্বাচনের ফলাফল আসতে শুরু করবে। তবে সব আসনের চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
ছবি: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার দৃশ্য। ৩ নভেম্বর ২০২৬।
এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট হচ্ছে। পাশাপাশি সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং দুটি বিশেষ নির্বাচন। ফলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে অন্তত তিনটি আসন বাড়াতে হবে। অন্যদিকে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে তাদের অন্তত চারটি আসন বাড়ানো প্রয়োজন। এই হিসাব অনুযায়ী প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সামনে তুলনামূলক সহজ সুযোগ থাকলেও সিনেটের লড়াই অনেক বেশি কঠিন।
রয়টার্সের নির্বাচনী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদের বেশির ভাগ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে প্রায় ৪৭টি আসনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব আসনের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে জয় পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জনমত জরিপে ইতিবাচক ইঙ্গিত রয়েছে। তবে সিনেটে তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, নেব্রাস্কা, ওহাইও, সাউথ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসের মতো রিপাবলিকানদের শক্তিশালী অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এসব জায়গায় অপ্রত্যাশিত ফলাফল এলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলে যেতে পারে।
নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয়, বাড়িভাড়া এবং জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলছে। অনেক ভোটার মনে করছেন, বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক নীতির কারণে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন আরও ব্যয়বহুল হয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।
ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও নির্বাচনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছে। বিশেষ করে যুদ্ধের প্রভাব, জ্বালানির দাম এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও নির্বাচনী প্রচারে ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছেন। অক্টোবরের শুরু থেকে তিনি দুই ডজনের বেশি নির্বাচনী সমাবেশ করেছেন। এসব সমাবেশে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন চেয়েছেন এবং ভোটারদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে এবারের নির্বাচনকে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতি সমর্থনের পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসনব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রেসিডেন্টের আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন। বাজেট, অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, করনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ নজর রয়েছে মিশিগানের সিনেট নির্বাচনেও। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ এবং রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। এল-সাইয়েদ নির্বাচিত হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার সুযোগ পাবেন। এই নির্বাচন শুধু একটি আসনের লড়াই নয়, বরং অভিবাসী পরিবার, মুসলিম ভোটার এবং মধ্যপ্রাচ্যনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনও আলোচনায় রয়েছে। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো এবং রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য সাফল্য জাতীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে নির্বাচনের আগে পাওয়া জনমত জরিপকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
আলাস্কার সিনেট নির্বাচন নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলার বিরুদ্ধে তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ড্যান সুলিভানের নামের সঙ্গে মিল রয়েছে এমন একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচনে আনার বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে। পেলটোলা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হলেও নির্বাচনের ফলাফল চূড়ান্ত হওয়ার আগে অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এদিকে নির্বাচনের দিন কিছু এলাকায় ভোট গ্রহণ ও ভোট গণনায় প্রযুক্তিগত সমস্যার খবর পাওয়া গেছে। জর্জিয়া, আইওয়া, মিসিসিপি এবং নিউইয়র্কের কয়েকটি এলাকায় কাগজের ব্যালট গণনার যন্ত্রে সমস্যা দেখা দেয়। নিউইয়র্কের ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টিতে যন্ত্রের সমস্যার কারণে কিছু ব্যালট গণনায় দেরি হয়। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব ব্যালট নিরাপদে রাখা হয়েছে এবং ভোটারদের ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু ছিল।
ফ্লোরিডার কয়েকটি এলাকায় অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে ভোটকেন্দ্র পরিবর্তন করতে হয়েছে। পেনসিলভানিয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনার কিছু কেন্দ্রেও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে ভোট গ্রহণের সময় বাড়ানো হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, এসব সমস্যা স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল এবং অধিকাংশ জায়গায় ভোটগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই চলেছে।
নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, নির্বাচনের দিন দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যে প্রায় এক হাজার পর্যবেক্ষক ও নজরদারি কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে। তবে এই উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের একাংশের আশঙ্কা, অতিরিক্ত সরকারি নজরদারি ভোটারদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণকে নিয়মিত নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর সংবাদমাধ্যম ও নির্বাচনী তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন এলাকার ভোটের হিসাব সংগ্রহ করবে। কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করার আগে দেখা হবে, বাকি ভোটের মাধ্যমে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর জয়ী হওয়ার বাস্তব সুযোগ আছে কি না। সব ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেও কোনো কোনো আসনে বিজয়ী নির্ধারণ করা সম্ভব। তবে কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফল পেতে বেশি সময় লাগতে পারে।
এ কারণে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কোনো দলের জয় বা পরাজয় নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রাথমিক ফলাফল, ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট, আগাম ভোট এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের যাচাই করা হিসাব একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কিছু এলাকায় পুনর্গণনা বা আইনি বিরোধ দেখা দিলে ফলাফলের চূড়ান্ত ঘোষণা আরও পিছিয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্যও এবারের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্যরা অভিবাসন আইন, শিক্ষার্থীদের ভিসা, স্বাস্থ্যবিমা, কর্মসংস্থান, কর এবং বিদেশে বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের বিভিন্ন বিষয়ে আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে অভিবাসন নীতি ও বৈধভাবে বসবাসের সুযোগ নিয়ে দুই দলের অবস্থান ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই কোনো অভিবাসন আইন পরিবর্তন হয়ে যাবে, এমন নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না; বরং কংগ্রেসের সদস্য এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা বর্তমান প্রেসিডেন্টের কাজের প্রতি নিজেদের সমর্থন বা অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ পান।
এবারের নির্বাচনের ফলাফল শুধু রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যা নির্ধারণ করবে না, বরং আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতিপথও নির্ধারণ করবে। এখন সবার নজর ভোট গণনার দিকে। কোন দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে, আর কোন দল নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে, তার উত্তর মিলবে ধাপে ধাপে প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফলে।
আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।