প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটিতে বাড়ছে বাংলাদেশিদের ব্যবসা, রাজনীতি ও সামাজিক প্রভাব
নিউ জার্সির দুই শহরে বাংলাদেশিদের বসতি, ব্যবসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ দৃশ্যমানভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, বদলাচ্ছে প্রবাসজীবনের চিত্র নতুনভাবে।
প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটিতে বাড়ছে বাংলাদেশিদের ব্যবসা, রাজনীতি ও সামাজিক প্রভাব
৭,৫৪৬ বার পড়া হয়েছে ১০ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের প্যাটারসন শহর দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। শহরটির ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের একটি অংশ এখন বাংলাদেশ বুলেভার্ড নামে পরিচিত। দুই পাশের বাংলাদেশি দোকান, খাবারের প্রতিষ্ঠান, পোশাকের ব্যবসা, মসজিদ এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের উপস্থিতি এলাকাটিকে প্রবাসীদের কাছে এক পরিচিত বাংলাদেশি জনপদে পরিণত করেছে। অন্যদিকে একই অঙ্গরাজ্যের আটলান্টিক সিটিতেও বাংলাদেশিদের বসতি, পারিবারিক ব্যবসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যক্রম দৃশ্যমান হচ্ছে। এই দুই শহরের বাংলাদেশি কমিউনিটির বিকাশ এখন শুধু বসবাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় অর্থনীতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড, নতুন অভিবাসীদের সহযোগিতা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নগর রাজনীতিতেও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। ফলে প্যাটারসনকে অনেকেই নতুন লিটল বাংলাদেশ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তবে এটি কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি উপাধি নয়; বরং বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকার পরিচিতি বোঝাতে ব্যবহৃত একটি প্রচলিত বর্ণনা। প্যাটারসনে বাংলাদেশিদের উপস্থিতির ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীরা প্রথমে কাজ, বাসস্থান ও উন্নত জীবনের সন্ধানে এই শহরে বসতি গড়েন। আশির দশক থেকে বাংলাদেশিদের আগমন বাড়তে থাকে। পরবর্তী দুই দশকে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের মাধ্যমে নতুন অভিবাসীদের আসা আরও সহজ হয়। একসময় যারা নিজেদের নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এখন এই শহরের ব্যবসা, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে প্যাটারসনের বাংলাদেশি কমিউনিটির আকার প্রায় ১৫ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশি জনসংখ্যার দিক থেকে নিউইয়র্ক শহরের পর প্যাটারসন অন্যতম বড় কেন্দ্র। ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের অনেক দোকান, খাবারের প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও ওষুধের দোকানে বাংলা ভাষায় কথা বলার সুযোগ রয়েছে। নতুন অভিবাসীদের জন্য এই পরিবেশ অনেক বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। শহরটির বাংলাদেশি পরিচিতি আরও দৃশ্যমান হয় ২০১৯ সালের জুনে। সে সময় প্যাটারসন পৌর কর্তৃপক্ষ ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের শেরিডান অ্যাভিনিউ থেকে ওয়েন অ্যাভিনিউ পর্যন্ত প্রায় দুই ব্লকের একটি অংশের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ বুলেভার্ড করে। বাংলাদেশি কমিউনিটির দীর্ঘদিনের অবদান ও সাংস্কৃতিক পরিচিতির স্বীকৃতি হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নামকরণ উপলক্ষে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটি নেতারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এই নামকরণ শুধু একটি সড়কের নাম পরিবর্তন ছিল না। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি শহরে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সামাজিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক পরিচিতির স্বীকৃতি। বর্তমানে ওই এলাকার আশপাশে বাংলাদেশি মালিকানাধীন বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পারিবারিক ব্যবসা প্যাটারসনের বাংলাদেশি কমিউনিটির অর্থনৈতিক বিকাশের অন্যতম ভিত্তি। অনেক পরিবার ছোট দোকান, মুদি ব্যবসা, খাবারের প্রতিষ্ঠান, পোশাকের দোকান ও অন্যান্য সেবামূলক কাজের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পরিবারের একাধিক সদস্য কাজ করেন। কোথাও বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানরা ব্যবসা পরিচালনায় যুক্ত হচ্ছেন, কোথাও আবার দ্বিতীয় প্রজন্ম নতুন চিন্তাভাবনা নিয়ে ব্যবসাকে এগিয়ে নিচ্ছে। ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ের আশপাশে বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় পণ্যের দোকানগুলোতে চাল, ডাল, মাছ, মাংস, মসলা, শাকসবজি, দেশীয় খাবার এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া যায়। এসব দোকান নতুন অভিবাসীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে আসা অনেক পরিবার পরিচিত খাবার ও প্রয়োজনীয় পণ্য সহজে কিনতে পারছেন। একই সঙ্গে এসব ব্যবসা স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখছে। প্যাটারসনের বাংলাদেশি ব্যবসার পরিচিত উদাহরণ হিসেবে বাংলা টাউন সুপারমার্কেটের কথা বলা যায়। ইউনিয়ন অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানে দেশীয় খাদ্যপণ্য ও হালাল মাংস পাওয়া যায়। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় আরও দক্ষিণ এশীয় মুদি দোকান ও খাবারের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় ক্রেতাদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাজারে একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রাজনীতিতেও প্যাটারসনের বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের ইতিহাস রয়েছে। ২০১২ সালে মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান শহরটির দ্বিতীয় ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে উত্তর নিউ জার্সিতে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিতি পান। পরবর্তী সময়ে শাহিন খালিকও দ্বিতীয় ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসব ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির উপস্থিতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝতে হলে ২০২৬ সালের নির্বাচনের দিকেও নজর দিতে হবে। ১২ মে প্যাটারসনের মেয়র নির্বাচনে সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি ১ হাজার ৯৫৪ ভোট পান। অন্যদিকে মেয়র আন্দ্রে সায়েগ তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন। একই নির্বাচনে কাউন্সিলের তিনটি বড় আসনের জন্য বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি ৩ হাজার ৬০৮ ভোট পেলেও শীর্ষ তিনজনের মধ্যে থাকতে পারেননি। অর্থাৎ বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিধি বাড়লেও নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো প্রতিযোগিতা রয়েছে।
প্যাটারসনের মতো আটলান্টিক সিটিতেও বাংলাদেশি কমিউনিটির বিকাশের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিবাসন, পারিবারিক যোগাযোগ এবং সামাজিক সংগঠনের ভূমিকা। আটলান্টিক সিটি মূলত পর্যটন, সমুদ্রসৈকত ও বিনোদনকেন্দ্রিক অর্থনীতির জন্য পরিচিত হলেও সেখানে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর একটি স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছে। স্থানীয় বাংলাদেশি সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটলান্টিক কাউন্টিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রায় ১২ হাজার মানুষ বসবাস করেন। এর মধ্যে আটলান্টিক সিটিতেই প্রায় ৫ হাজার মানুষের বসবাস বলে ২০২২ সালে স্টকটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল। এই সংখ্যাগুলো স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধির দেওয়া হিসাব, নতুন আদমশুমারির চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নয়।
আটলান্টিক সিটিতে বাংলাদেশিদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একটি পরিচিত দিক হলো মুদি দোকান ও খাবারের ব্যবসা। দেশীয় চাল, ডাল, মসলা, মাছ, হালাল মাংস, শাকসবজি এবং দক্ষিণ এশীয় খাবারের চাহিদা পূরণে বিভিন্ন দোকান কাজ করছে। আটলান্টিক অ্যাভিনিউয়ের দেশি বাজার ও পণ্য বিক্রির প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় বাংলাদেশি এবং অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় পরিবারের কাছে পরিচিত। এর মধ্যে দেশি বাজার অ্যান্ড প্রডিউস একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। এখানে দক্ষিণ এশীয় খাদ্যপণ্য, মাছ, মাংস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যায়। এসব ব্যবসার গুরুত্ব শুধু পণ্য কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন কোনো বাংলাদেশি পরিবার আটলান্টিক সিটিতে এলে কোথায় দেশীয় খাবার পাওয়া যাবে, কোথায় প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হবে কিংবা পরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে, সে বিষয়ে এসব প্রতিষ্ঠান সহায়তা করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কমিউনিটির মানুষের মিলনস্থল হিসেবেও কাজ করে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। শহরটিতে আল-হেরা মসজিদ এবং অন্যান্য মসজিদ মুসলমানদের নামাজ, ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে। আল-হেরা মসজিদের নিজস্ব পরিচিতি অনুযায়ী, এটি আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশি মুসলিম কমিউনিটির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমার নামাজ, শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা, কোরআন শিক্ষা এবং তরুণদের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
মসজিদগুলো রমজান মাসে ইফতার, দান কার্যক্রম এবং বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে। ২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল আল-হেরা মসজিদে দক্ষিণ জার্সির জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে বড় ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আয়োজকদের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৭০০ মানুষ অংশ নেন। এ ধরনের আয়োজন প্রমাণ করে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু উপাসনার জায়গা নয়; প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক সংযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তবে আটলান্টিক সিটিতে মসজিদের সংখ্যা ঠিক কত এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কতটি নতুন মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য ধারাবাহিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তাই মসজিদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে নির্দিষ্ট দাবি করার পরিবর্তে বলা যায়, শহরটিতে বাংলাদেশি মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের উপস্থিতি সুস্পষ্ট। আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশিদের সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ জার্সি স্থানীয় কমিউনিটির একটি পরিচিত সংগঠন। সংগঠনটি ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর লক্ষ্য বাংলাদেশি ঐতিহ্য, ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখা এবং প্রবাসীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো। সংগঠনটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পিঠা উৎসব, ঈদবাজার, পারিবারিক আয়োজন, খাদ্য বিতরণ এবং নতুন প্রজন্মের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল আটলান্টিক সিটিতে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সংগঠনটির আয়োজনে বর্ষবরণ ও বৈশাখী মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গান, কবিতা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, দেশীয় খাবার এবং বিভিন্ন পণ্যের দোকান ছিল। স্থানীয় বাংলাদেশিদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার প্রবাসীরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। একই বছরের ১২ আগস্ট আটলান্টিক সিটির স্যান্ডক্যাসল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ জার্সির উদ্যোগে সাংস্কৃতিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের শিল্পীদের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের শিল্পীরাও অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, মেধাবীদের সম্মাননা, দেশীয় খাবার ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল আয়োজনের উল্লেখযোগ্য অংশ। অনুষ্ঠানে আটলান্টিক সিটির মেয়র, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি পরিবারগুলো নিজেদের সংস্কৃতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া অনেক শিশু-কিশোর বাংলা ভাষা, গান, খাবার ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছেও বাংলাদেশি সংস্কৃতি পরিচিত হচ্ছে। প্রবাসীদের নাগরিক ও প্রশাসনিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশি সংগঠনগুলো ভূমিকা রাখছে। ২০২২ সালে স্টকটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আটলান্টিক সিটি ক্যাম্পাসে বাংলাদেশের নিউইয়র্ক কনস্যুলেটের প্রতিনিধিরা স্থানীয় বাংলাদেশিদের জন্য পাসপোর্ট ও ভিসাসংক্রান্ত সেবা দিতে এসেছিলেন। স্থানীয় বাংলাদেশি সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত ওই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কাজের জন্য প্রবাসীদের নিউইয়র্ক পর্যন্ত যাতায়াতের ঝামেলা কমানো। এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ১০ নভেম্বর আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশ কমিউনিটি সেন্টারে এক দিনের ভ্রাম্যমাণ কনস্যুলার সেবা আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ১ নভেম্বর প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ জার্সি, নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনস্যুলেট এবং আটলান্টিক সিটির বহুসাংস্কৃতিক সেবা বিভাগের সহযোগিতায় এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে ই-পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, দ্বৈত নাগরিকত্ব, অনাপত্তিপত্র এবং বিভিন্ন নথি সত্যায়নের মতো সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশিরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেয়র, কাউন্সিলর, রাজ্য আইনপ্রণেতা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কমিউনিটির সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশি সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা স্থানীয় বিভিন্ন সভা ও নাগরিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন। এর ফলে প্রবাসীদের শিক্ষা, ব্যবসা, নাগরিক সেবা ও সামাজিক সমস্যাগুলো স্থানীয় প্রশাসনের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটির মধ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও দুটি শহরের বাংলাদেশি কমিউনিটির বিকাশের পেছনে কয়েকটি বিষয় একই। প্রথমত, পারিবারিক ও আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমে নতুন অভিবাসীদের বসতি গড়ে উঠছে। দ্বিতীয়ত, ছোট ব্যবসা ও পারিবারিক উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত হচ্ছে। তৃতীয়ত, মসজিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করছে। সর্বোপরি, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থী ও তরুণেরা স্থানীয় সমাজে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, কোনো অভিবাসী জনগোষ্ঠীর স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। ব্যবসার মালিকানা, শিক্ষায় সাফল্য, স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নাগরিক সংগঠনে নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটিতে বাংলাদেশিদের কার্যক্রমে এসব পরিবর্তনের কিছু স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। তবে এই দুই শহরে বাংলাদেশি ব্যবসার সংখ্যা কত বেড়েছে, কতটি নতুন পারিবারিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে কিংবা গত পাঁচ বছরে কতটি নতুন মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য তুলনামূলক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা দিয়ে ব্যবসা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধির হার দাবি করা ঠিক হবে না। একইভাবে দুই শহরের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশিদের মালিকানাধীন নয়। তবে স্থানীয় ব্যবসার উপস্থিতি, সাংস্কৃতিক আয়োজন, সংগঠনের কার্যক্রম এবং জনসংখ্যার তথ্য থেকে কমিউনিটির বিস্তারের বিষয়টি স্পষ্ট। সব মিলিয়ে প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটি এখন নিউ জার্সিতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি কেন্দ্র। প্যাটারসনে বাংলাদেশ বুলেভার্ড, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক উপস্থিতি এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ একটি প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি জনপদের পরিচয় তুলে ধরছে। অন্যদিকে আটলান্টিক সিটিতে পারিবারিক ব্যবসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রশাসনিক যোগাযোগের মাধ্যমে কমিউনিটি আরও সংগঠিত হচ্ছে। একসময় যারা উন্নত জীবনের সন্ধানে বাংলাদেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন, তাদের অনেকের সন্তান এখন যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। কেউ পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনা করছে, কেউ পেশাজীবী হিসেবে কাজ করছে, আবার কেউ স্থানীয় রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশিদের পরিচিতি এখন শুধু অভিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির অংশ হিসেবেও তাদের অবস্থান তৈরি হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এই পরিবর্তন নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে ভবিষ্যতে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে ব্যবসার পাশাপাশি শিক্ষা, তরুণ নেতৃত্ব, ভোটার নিবন্ধন, নাগরিক অধিকার এবং স্থানীয় নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। তাহলেই প্যাটারসন ও আটলান্টিক সিটির বাংলাদেশি কমিউনিটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর সমাজে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।