অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
মামদানির নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ, নিউইয়র্কে সক্রিয় বাংলাদেশি ও মুসলিম প্রবাসীরা
নিউইয়র্কে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় জেনোসাইড ৭১ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ, অন্যদিকে জোহরান মামদানির নেতৃত্বে বাংলাদেশি ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
৮,৬৪১ বার পড়া হয়েছে ৯ মিনিটে পড়ুন
নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ এবং স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস, ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার এবং শহরের অন্যান্য বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি বাড়ছে। একদিকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণে প্রবাসী সংগঠনগুলোর তৎপরতা, অন্যদিকে নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা।
সাম্প্রতিক সময়ে এ আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে জেনোসাইড ৭১ ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদ সম্মেলন। সংগঠনটির উদ্যোগে গত ৩০ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের নবান্ন পার্টি সেন্টারে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১ নভেম্বর প্রকাশিত একটি প্রবাসী সংবাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, অনুষ্ঠানটি ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত কোনো প্রতিবাদ সমাবেশ নয়; এটি ছিল দুই দিন আগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
সংগঠনটির সংবাদ সম্মেলনের মূল আলোচনায় ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মারক শিখা অনির্বাণের নিরবচ্ছিন্ন প্রজ্বলন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারির দাফন নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত শিখা অনির্বাণের চিরজ্বলন্ত শিখা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে তাঁরা উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারির দাফনে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের বিষয়টি নিয়েও তাঁরা আপত্তি ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. প্রদীপ রঞ্জন কর লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মনজুর চৌধুরী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। প্রতিবেদনে আরও যাঁদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাংবাদিক ও সংগঠনের উপদেষ্টা হাকিকুল ইসলাম খোকন, প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন তালুকদার, শওকত আকবর রীতি, খুরশিদ আনোয়ার বাবলু, ফারুক হোসাইনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের কয়েকজন নেতা-কর্মী।
সংগঠনটির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, শিখা অনির্বাণ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সাহস, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের স্মারক। তাঁদের মতে, এটি শুধু একটি সামরিক স্মৃতিচিহ্ন নয়; বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় আত্মত্যাগের প্রতীক। তাই স্মারকটির শিখা সার্বক্ষণিকভাবে জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা উচিত।
এ বিষয়ে সংগঠনটি বাংলাদেশ সরকার, সেনাবাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি দাবি জানিয়েছে। তাদের দাবি, শিখা অনির্বাণের আগুন পুনরায় প্রজ্বলিত করতে হবে, ভবিষ্যতে যেন তা বন্ধ না হয় সে জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রবাসী সংগঠন হিসেবে তারা আর্থিক সহায়তা দিতেও প্রস্তুত।
অন্যদিকে, শিখা অনির্বাণ বন্ধ রাখার বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের প্রতিবেদনে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, জ্বালানি সাশ্রয়ের সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে স্মারকটির শিখা আপাতত সার্বক্ষণিকভাবে জ্বালিয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হলে সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা এবং সংগঠনটির দাবিকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। সংগঠনের অভিযোগ বা বক্তব্যকে সরকারি তদন্তে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
মানিক পশারির দাফন নিয়ে বিতর্কও সংবাদ সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল। সংগঠনটির প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। তাঁরা এ ঘটনাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে দেখছেন। এ বিষয়ে সংগঠনটি প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তিদের নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চালানোর কথাও জানিয়েছে।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, দাফনের আনুষ্ঠানিক নথি কিংবা স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্ণাঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায়নি। তাই কারা বাধা দিয়েছেন, কী কারণে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং ঘটনার পুরো প্রেক্ষাপট কী—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য জ্যাকসন হাইটস শুধু একটি বাণিজ্যিক এলাকা নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি ব্যবসা, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এখানে বাংলাদেশি খাবারের দোকান, পোশাকের ব্যবসা, বিভিন্ন সংগঠনের কার্যালয় এবং কমিউনিটির নানা অনুষ্ঠান নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয় দিবস, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে আলোচনা ও কর্মসূচিও দেখা যায়।
তবে নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের বসতি শুধু জ্যাকসন হাইটসে সীমাবদ্ধ নয়। কুইন্সের জ্যামাইকা, উডসাইড, এলমহার্স্ট, রিচমন্ড হিল এবং ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার ও সাউন্ডভিউ এলাকায়ও উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশি জনগোষ্ঠী রয়েছে। ব্রুকলিনেও বাংলাদেশিদের বসতি, ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড রয়েছে। ফলে কুইন্স ও ব্রুকলিনকে একমাত্র প্রধান বাংলাদেশি বসতি হিসেবে উল্লেখ করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়; ব্রঙ্কসও বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
নিউইয়র্ক নগর পরিকল্পনা বিভাগের ২০২৬ সালের নতুন অভিবাসী জনগোষ্ঠীসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগরীতে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩১ লাখ। কুইন্স ও ব্রুকলিনে বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশও নিউইয়র্কের বৃহৎ অভিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্যতম উৎসদেশ হিসেবে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের জনসংখ্যার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
এই জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির নির্বাচিত হওয়া মুসলিম, দক্ষিণ এশীয় এবং অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তিনি ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম, প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এবং আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম মেয়র।
মামদানির নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে দক্ষিণ এশীয় ও মুসলিম ভোটারদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনী তৎপরতা আগের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ২০২৫ সালের নির্বাচনের ভোটারসংক্রান্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশি ভোটারদের অংশগ্রহণ বেড়েছিল প্রায় ৩৮৬ শতাংশ। একই সময়ে দক্ষিণ এশীয় ভোটারদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই পরিসংখ্যান নিউইয়র্কের রাজনীতিতে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরে।
মামদানির নির্বাচনী প্রচারণায় শুধু মুসলিম পরিচয় নয়, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ, শিশুদের যত্নের সুযোগ বৃদ্ধি, অভিবাসীদের অধিকার এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ কমানোর প্রতিশ্রুতিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব বিষয় বাংলাদেশি ও অন্যান্য অভিবাসী পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে যেসব পরিবার উচ্চ বাড়িভাড়া, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং সন্তানদের লালন-পালনের ব্যয় নিয়ে চাপে রয়েছে, তাদের কাছে এসব প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে বাংলাদেশি ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর সবাই যে মামদানিকে সমর্থন করেছেন, এমন নয়। নির্বাচনের সময় দক্ষিণ এশীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁর সমর্থক যেমন ছিলেন, তেমনি সমালোচকও ছিলেন। কেউ তাঁর অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন, আবার কেউ সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। ফলে তাঁর নির্বাচিত হওয়াকে সব বাংলাদেশি বা মুসলিম ভোটারের অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
মামদানি মেয়র হওয়ার পরও বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। গত ২০ অক্টোবর জ্যাকসন হাইটসের ওম শক্তি মন্দিরে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আয়োজিত দুর্গাপূজার সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি সমাজে বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অবদান এবং নিউইয়র্কের বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁদের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে ২২ অক্টোবর এ খবর প্রকাশিত হয়।
এ ঘটনাটি বাংলাদেশি প্রবাসীদের সঙ্গে নগর প্রশাসনের যোগাযোগের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। কারণ বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রয়েছে। মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ নিউইয়র্কে বসবাস করেন। তাঁদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে নগর প্রশাসনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সংগঠিত হওয়ার বিষয়টিও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মামদানির নির্বাচনী সাফল্যের পর নিউইয়র্কের মুসলিম জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক সংগঠন ও নাগরিক উদ্যোগে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ব্রঙ্কসের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের নেতারাও স্থানীয় নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুলিশি ব্যবস্থা, শিক্ষা, ব্যবসা ও নগর পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়েও মতপার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশি আমেরিকানদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠনও কাজ করছে। গত ৪ অক্টোবর কুইন্সের উডসাইডে বাংলাদেশি আমেরিকান অ্যাডভোকেসি গ্রুপ একটি নাগরিক ও রাজনৈতিক সচেতনতামূলক সভার আয়োজন করে। সেখানে ভোটার নিবন্ধন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতিতে যুক্ত করা এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে কমিউনিটির দাবি তুলে ধরার বিষয়ে আলোচনা হয়। সংগঠনটির সভাপতি জয়নাল আবেদিনসহ অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শুধু জনসংখ্যা বেশি হলেই রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হয় না; এজন্য নিয়মিত ভোট দেওয়া, সংগঠিত থাকা এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি।
এদিকে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নিউইয়র্কের অভিবাসী ভোটারদের মধ্যেও নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে অভিবাসী ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে জীবনযাত্রার ব্যয়, বাড়িভাড়া এবং অভিবাসন কর্তৃপক্ষের তৎপরতার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় ভোটারদের কাছে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মামদানির নির্বাচনী জয়ের পর গত বছরের রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবারের নির্বাচনে কতটা বজায় থাকে, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয়।
নিউইয়র্কের বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে, নগর প্রশাসনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধিত্ব কতটা বাড়বে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে নেতৃত্ব তৈরির সুযোগ কতটা তৈরি হবে এবং অভিবাসী পরিবারগুলোর বাস্তব সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারকদের কাছে কতটা গুরুত্ব পাবে—এসব বিষয় আগামী দিনের রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর প্রভাব ফেলবে।
এ ক্ষেত্রে কুইন্স, ব্রঙ্কস ও ব্রুকলিনের বাংলাদেশি সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিভিন্ন সংগঠন যদি শুধু বিশেষ দিবস বা রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় নয়, সারা বছর নাগরিক অধিকার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিবাসনসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে কাজ করে, তাহলে তাদের সম্মিলিত কণ্ঠ আরও শক্তিশালী হতে পারে।
একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রবাসে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় তুলে ধরার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রজন্মের অনেক বাংলাদেশি আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেছে বা ছোটবেলায় সেখানে এসেছে। তাদের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, স্বাধীনতার ইতিহাস এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ তুলে ধরতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, ইতিহাসভিত্তিক প্রদর্শনী ও শিক্ষামূলক উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি সম্প্রদায় এখন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক—তিন ক্ষেত্রেই নিজেদের অবস্থান আরও দৃশ্যমান করার চেষ্টা করছে। জেনোসাইড ৭১ ফাউন্ডেশনের সংবাদ সম্মেলন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও জাতীয় প্রতীক সংরক্ষণের দাবিকে সামনে এনেছে। অন্যদিকে মামদানির মেয়র হওয়া এবং দক্ষিণ এশীয় ভোটারদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি প্রবাসীদের রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রকৃত সাফল্য শুধু একজন মুসলিম বা দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তির মেয়র হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সাধারণ অভিবাসী পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার উন্নতি, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা, বৈষম্য কমানো এবং সব সম্প্রদায়ের সমান সুযোগ তৈরির মধ্য দিয়েই সেই সাফল্য মূল্যায়ন করা হবে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই নতুন রাজনৈতিক সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও নাগরিক উন্নয়নে কাজে লাগানো।
আরও পড়ুন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬

ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০ হাজার ভোটারের তালিকায় ৪২ শতাংশ নামের মিল নেই

ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটের ব্যালট নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আদালতে লড়াইয়ে গভর্নর নিউসম

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে ৩৭ শতাংশ, ইতিবাচক সমর্থন মাত্র আট রাজ্যে






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।