বাংলাদেশ বিমানের নামে ভুয়া নিয়োগ ফরম, ব্যক্তিগত তথ্য ও টাকা না দিতে সতর্কতা
৮,৬৪৫ বার পড়া হয়েছে ৭ মিনিটে পড়ুন
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নামে চাকরিপ্রার্থীদের তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একটি অননুমোদিত অনলাইন আবেদন ফরম ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি নজরে আসার পর চাকরিপ্রার্থীসহ সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থাটি। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তাদের নামে প্রচারিত ওই ফরমের সঙ্গে বিমানের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো ফরম তৈরি, চালু কিংবা অনুমোদনও দেওয়া হয়নি। গত ৩১ অক্টোবর শনিবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বিমানের নাম ব্যবহার করে একটি অননুমোদিত অনলাইন ফরমের মাধ্যমে নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অথচ বিমান কর্তৃপক্ষ এ ধরনের কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ফলে ওই ফরমের মাধ্যমে পরিচালিত তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রমের দায়ভারও সংস্থাটি নিচ্ছে না। চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পাওয়ার আশায় অনেক মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করেন। চাকরির আশায় তাঁরা নিজেদের নাম, ঠিকানা, মুঠোফোন নম্বর, পরিচয়পত্রের তথ্য, শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে থাকেন। প্রতারকেরা এসব আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে ভুয়া আবেদন ফরম তৈরি করতে পারে। ফলে যাচাই না করে কোনো ফরমে তথ্য জমা দেওয়া বিপদের কারণ হতে পারে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, তাদের নিয়োগ কার্যক্রম নির্দিষ্ট নিয়ম ও অনুমোদিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর দেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি চাকরিপ্রার্থীদের আবেদন গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য টেলিটকের নির্ধারিত অনলাইন নিয়োগব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংস্থাটির অনুমোদিত ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হয়।
অর্থাৎ বিমানের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো আবেদন ফরম, চাকরির বিজ্ঞপ্তি কিংবা নিয়োগের প্রস্তাব দেখলেই সেটিকে আসল বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিজ্ঞপ্তিটি কোথায় প্রকাশিত হয়েছে, আবেদন করার জন্য কোন ওয়েব ঠিকানা দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য বিমানের অনুমোদিত মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেগুলো যাচাই করা জরুরি। এ বিষয়ে বিমান কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে, অপরিচিত কোনো লিংক কিংবা অননুমোদিত আবেদন ফরমে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে এসব ফরমের মাধ্যমে কেউ অর্থ দাবি করলে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন করা যাবে না। চাকরির আবেদন করার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সত্যতা নিশ্চিত করা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি বিমানের কর্মকর্তা, নিয়োগ বিভাগের প্রতিনিধি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মচারী পরিচয় দিয়ে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেয়, তাহলে শুধু পরিচয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য সংস্থার অনুমোদিত মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে কেউ যদি চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবি করে, তাহলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে আবেদন ফি, নিবন্ধন ফি, প্রশিক্ষণ ফি, জামানত কিংবা অন্য কোনো খরচের কথা বলে অর্থ চাওয়া হলে সেটি ভালোভাবে যাচাই না করে টাকা দেওয়া উচিত নয়। বিমান কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তায় অননুমোদিত ফরমের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন না করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের প্রতারণার আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার। একটি অনলাইন ফরমে নাম, জন্মতারিখ, মুঠোফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অন্যান্য তথ্য চাওয়া হতে পারে। চাকরির আবেদনের কথা বিশ্বাস করে অনেকেই এসব তথ্য দিয়ে দেন। কিন্তু ফরমটি যদি প্রকৃত নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ না হয়, তাহলে এসব তথ্য কারা সংগ্রহ করছে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, তা জানা সম্ভব হয় না। ব্যক্তিগত তথ্য অন্যের হাতে চলে গেলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও প্রতারণার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। যেমন, চাকরির ভুয়া প্রস্তাব দিয়ে আবারও অর্থ দাবি করা, পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কোনো অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনা করা কিংবা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে আরও সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নামে ছড়িয়ে পড়া নির্দিষ্ট ফরমটির মাধ্যমে এসব অপরাধ ইতিমধ্যে ঘটেছে, এমন কোনো তথ্য কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়নি। তাই সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকাই এখানে মূল বিষয়। চাকরিপ্রার্থীদের মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো অনলাইন ফরম দেখতে পেশাদার কিংবা বিশ্বাসযোগ্য হলেই সেটি আসল হয়ে যায় না। প্রতিষ্ঠানের নাম, প্রতীক, রঙ এবং কর্মকর্তাদের ছবি ব্যবহার করেও ভুয়া আবেদন ফরম তৈরি করা সম্ভব। অনেক সময় প্রতারকেরা আসল প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি ব্যবহার করে এমনভাবে প্রচারণা চালায়, যাতে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রথম দেখায় পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখার পর সরাসরি দেওয়া লিংকে প্রবেশ করে তথ্য জমা দেওয়ার পরিবর্তে নিজে প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত ওয়েবসাইট খুঁজে নেওয়া ভালো। সেখানে নিয়োগসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি আছে কি না, আবেদনের সময়সীমা কত দিন, কোন পদে লোক নেওয়া হচ্ছে এবং আবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত পদ্ধতি কী, তা মিলিয়ে দেখা উচিত। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীরা জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, সংস্থাটির অনুমোদিত ওয়েবসাইট এবং টেলিটকের নির্ধারিত নিয়োগ পোর্টাল থেকে তথ্য যাচাই করতে পারবেন। বিশেষ করে কোনো বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট পদের নাম, যোগ্যতা, বয়সসীমা, আবেদনের শেষ তারিখ এবং আবেদন ফি থাকলে তার নিয়মকানুন ভালোভাবে পড়ে নেওয়া উচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো পরিচিত ব্যক্তি বা আত্মীয় চাকরির আবেদন ফরম পাঠালেও সেটি যাচাই ছাড়া পূরণ করা ঠিক হবে না। কারণ পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে কোনো তথ্য পাওয়া গেলেই তার সত্যতা নিশ্চিত হয় না। অনেক সময় একজন ব্যবহারকারী নিজেও না বুঝে প্রতারণামূলক লিংক অন্যদের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারেন। ফলে চাকরিপ্রার্থীদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও পরিচিতজনদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন। কেউ যদি ইতিমধ্যে ওই অননুমোদিত ফরমে নিজের তথ্য দিয়ে থাকেন, তাহলে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। প্রথমে আর কোনো তথ্য বা অর্থ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকলে দ্রুত নিজের ব্যাংক বা আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। মুঠোফোনের গোপন সংকেত, একবার ব্যবহারযোগ্য যাচাইকরণ নম্বর কিংবা আর্থিক হিসাবের গোপন তথ্য কখনোই অপরিচিত কারও সঙ্গে ভাগ করা উচিত নয়। এ ছাড়া সন্দেহজনক ফরমের লিংক, সংশ্লিষ্ট বার্তা, ফোন নম্বর এবং অর্থ চাওয়ার কোনো প্রমাণ থাকলে সেগুলো সংরক্ষণ করা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট সাইবার অপরাধবিষয়ক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো যেতে পারে। এতে প্রতারণার ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া সহজ হতে পারে। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা বেশি থাকায় অনেক তরুণ-তরুণী সরকারি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ খোঁজেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মতো পরিচিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বাড়ে। এই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ ভুয়া নিয়োগের প্রলোভন দেখাতে পারে। তাই চাকরিপ্রার্থীদের আবেগ কিংবা তাড়াহুড়ার সুযোগ নিয়ে কেউ যেন ব্যক্তিগত তথ্য বা অর্থ হাতিয়ে নিতে না পারে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদেরও দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারের কেউ চাকরির আবেদন করতে চাইলে তাঁকে সঠিক ওয়েবসাইট ও আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানানো উচিত। বিশেষ করে নতুন চাকরিপ্রার্থীরা যেন অপরিচিত কারও আশ্বাসে অর্থ প্রদান না করেন, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এই সতর্কবার্তা শুধু একটি অনলাইন ফরম এড়িয়ে চলার বিষয় নয়; বরং চাকরির নামে ডিজিটাল প্রতারণা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। নিয়োগের তথ্য যাচাই না করে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া কিংবা অর্থ পরিশোধ করলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি আবারও জানিয়েছে, তাদের অনুমোদিত নিয়োগব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত কোনো অনলাইন ফরম বা কার্যক্রমের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। তাই চাকরিপ্রার্থীদের উচিত বিজ্ঞপ্তির সত্যতা নিশ্চিত করে নির্ধারিত মাধ্যমে আবেদন করা। সামান্য সতর্কতা অনেক বড় আর্থিক ক্ষতি ও ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে। সুতরাং বিমানের নামে প্রচারিত কোনো অপরিচিত আবেদন ফরম দেখলে তাতে তথ্য জমা না দিয়ে প্রথমে সংস্থার অনুমোদিত মাধ্যমে যাচাই করুন। চাকরির সুযোগের আশায় নিজের মূল্যবান ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা কষ্টার্জিত অর্থ ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন না।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।