অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে ৩৭ শতাংশ, ইতিবাচক সমর্থন মাত্র আট রাজ্যে
নির্বাচনের আগে এমারসন জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদন ৩৭ শতাংশ; সিভিকসের হিসাবে ৫০ রাজ্যের মধ্যে আটটিতে তাঁর নিট অনুমোদন ইতিবাচক, ৪২টিতে নেতিবাচক।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি থাকতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। সর্বশেষ দুটি জরিপে তাঁর জনসমর্থনের চিত্রে নেতিবাচক প্রবণতা উঠে এসেছে। এমারসন কলেজের ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত জাতীয় জরিপে ট্রাম্পের কাজের প্রতি অনুমোদন জানিয়েছেন ৩৭ শতাংশ ভোটার। বিপরীতে ৫৭ শতাংশ ভোটার তাঁর কাজের প্রতি অননুমোদন জানিয়েছেন। অন্যদিকে সিভিকসের রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্যের মধ্যে মাত্র আটটিতে ট্রাম্পের নিট অনুমোদনের হার ইতিবাচক। বাকি ৪২টি রাজ্যে এই হার নেতিবাচক। ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এই তথ্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
এমারসন কলেজের জরিপটি পরিচালিত হয় ২৪ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত। এতে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের এক হাজার সম্ভাব্য ভোটার। জরিপটির গ্রহণযোগ্যতার ব্যবধান প্রায় তিন শতাংশ। গবেষণায় ভোটারদের বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা, জাতিগত পরিচয়, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে তথ্য সমন্বয় করা হয়েছে। ফলে ৩৭ শতাংশ অনুমোদনের সংখ্যাটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের সম্ভাব্য ভোটারদের মতামত তুলে ধরে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিকের সরাসরি মতামত হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কংগ্রেস নির্বাচনে দুই প্রধান দলের প্রার্থীদের প্রতি ভোটারদের সমর্থনের ব্যবধান। এমারসন কলেজের হিসাবে, জাতীয় পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সমর্থন জানিয়েছেন ৫২ শতাংশ ভোটার। রিপাবলিকান দলের প্রার্থীদের পক্ষে রয়েছেন ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ দুই দলের মধ্যে ব্যবধান ১০ শতাংশ। প্রায় পাঁচ শতাংশ ভোটার তখনো সিদ্ধান্তহীন ছিলেন। এই পরিসংখ্যান নির্বাচনের আগে দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। তবে জাতীয় পর্যায়ের জরিপ দিয়ে প্রতিটি আসনের ফলাফল নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
রাজ্যভিত্তিক হিসাবেও ট্রাম্পের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। সিভিকসের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আলাবামা, আরকানসাস, আইডাহো, নর্থ ডাকোটা, ওকলাহোমা, ইউটা, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া এবং ওয়াইওমিং এই আটটি রাজ্যে তাঁর নিট অনুমোদনের হার ইতিবাচক রয়েছে। অন্যদিকে ৪২টি রাজ্যে অনুমোদনের তুলনায় অননুমোদনের হার বেশি। ওয়াইওমিংয়ে তাঁর নিট অনুমোদনের হার সবচেয়ে বেশি, ১৪ শতাংশ। কানসাসে অনুমোদন ও অননুমোদন উভয়ই ৪৬ শতাংশ হওয়ায় সেখানে হিসাবটি সমান অবস্থায় রয়েছে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আটটি রাজ্যে ট্রাম্পের নিট অনুমোদন ইতিবাচক থাকার অর্থ এই নয় যে ওই রাজ্যগুলোর সব ভোটার তাঁকে সমর্থন করেন। নিট অনুমোদন বলতে অনুমোদনকারীদের হার থেকে অননুমোদনকারীদের হার বাদ দেওয়ার পর যে ব্যবধান পাওয়া যায়, সেটিকে বোঝানো হয়েছে। একইভাবে কোনো রাজ্যে নিট অনুমোদন নেতিবাচক থাকলেই সেখানে তাঁর সব রাজনৈতিক সমর্থন শেষ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না।
বিশেষ করে সিনেট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে ট্রাম্পের নিট অনুমোদনের হার নেতিবাচক। আলাস্কায় এই হার ঋণাত্মক ২৫ শতাংশ, মিশিগানে ঋণাত্মক ২৬ শতাংশ, মেইনে ঋণাত্মক ২৯ শতাংশ, নর্থ ক্যারোলাইনায় ঋণাত্মক ১৮ শতাংশ, ওহাইওতে ঋণাত্মক ১৮ শতাংশ এবং টেক্সাসে ঋণাত্মক ২০ শতাংশ। এসব রাজ্যের নির্বাচনী প্রতিযোগিতা জাতীয় রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দুই দলই বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখছে। এমারসন কলেজের জরিপে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কোন বিষয়টি তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে। উত্তরে ৩৪ শতাংশ ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন। ২৮ শতাংশ ভোটার গুরুত্ব দিয়েছেন সরকারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে। কর কমানোকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন ১০ শতাংশ, অভিবাসন আইন সংস্কারকে আট শতাংশ এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিকে ছয় শতাংশ ভোটার অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাচনী আলোচনায় বড় জায়গা দখল করেছে।
রয়টার্স ও ইপসোসের ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত আরেকটি জরিপেও ট্রাম্পের অনুমোদন নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে তাঁর অনুমোদনের হার ছিল ৩২ শতাংশ এবং অননুমোদনের হার ৬৬ শতাংশ। তবে এই জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের মতামত নেওয়া হয়েছিল, আর এমারসনের জরিপে অংশ নিয়েছিলেন সম্ভাব্য ভোটাররা। তাই দুই জরিপের সংখ্যাকে সরাসরি একই জনগোষ্ঠীর ফলাফল হিসেবে তুলনা করা উচিত নয়। জরিপের সময়, নমুনা এবং পদ্ধতিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
আগামী ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের একাংশের আসনে ভোট হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যে গভর্নর ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারণে এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। রিপাবলিকানরা বর্তমানে দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা আসন বাড়িয়ে কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।
নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নিজেও রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তাঁর প্রশাসনের নীতি, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তাঁর সমর্থকেরা প্রশাসনের নীতির পক্ষে অবস্থান তুলে ধরছেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কার্যক্রম এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু স্থানীয় প্রার্থীদের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা নয়, প্রেসিডেন্টের নেতৃত্ব ও প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়ে ভোটারদের মনোভাব বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
তবে জরিপের ফলাফলকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখা যাবে না। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মতামত, ভোটার উপস্থিতি, স্থানীয় প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা এবং নির্বাচনী এলাকার রাজনৈতিক বাস্তবতা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। জাতীয় পর্যায়ে কোনো দলের পক্ষে সমর্থন বেশি থাকলেও প্রতিটি রাজ্য ও আসনের ফল ভিন্ন হতে পারে। একইভাবে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার কম থাকলেও তা সরাসরি সব রিপাবলিকান প্রার্থীর ভোট কমে যাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের ৩৭ শতাংশ অনুমোদন এবং ৪২টি রাজ্যে নেতিবাচক নিট অনুমোদনের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। তবে আগামী ৩ নভেম্বরের ভোটের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত জানাবে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে এবং ভোটাররা বর্তমান প্রশাসনের কার্যক্রম সম্পর্কে কী ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দিতে চান।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে শেষ প্রচার, হাউসে এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা

টেক্সাসের নির্বাচনী সমাবেশে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ‘অযোগ্য’ বললেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স

নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগকে আদালতের নির্দেশ







মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।