এক ঘণ্টা সময় ফিরে পেল যুক্তরাষ্ট্র, বদলে গেল কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন
যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের প্রথম দিনে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়েছে, অধিকাংশ এলাকায় ফিরেছে প্রমিত সময়, বদলেছে মানুষের ঘুম ও দৈনন্দিন সময়সূচি।
যুক্তরাষ্ট্রে ১ নভেম্বর ২০২৬, রবিবার দিবালোক সাশ্রয়ী সময়ের অবসান ঘটেছে। দেশটির অধিকাংশ অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলে স্থানীয় সময় রাত দুইটা থেকে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে রাত একটায় ফিরেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত এক ঘণ্টা সময় পেয়েছেন। অনেকের জন্য এটি বাড়তি এক ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দেশটির দৈনন্দিন কর্মসূচি, যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সময়সূচিতে পরিবর্তন এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মান ও প্রযুক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দিবালোক সাশ্রয়ী সময় শুরু হয়েছিল ৮ মার্চ। ওই দিন স্থানীয় সময় রাত দুইটার পর ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে রাত তিনটা করা হয়েছিল। এর ফলে মানুষ এক ঘণ্টা সময় হারিয়েছিলেন। প্রায় আট মাস পর ১ নভেম্বর সেই সময় আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার রাত দুইটা থেকে ঘড়ির কাঁটা রাত একটায় ফিরে যাওয়ায় রাত একটার সময়টি দুইবার এসেছে। ফলে ওই দিনের মোট সময় হয়েছে ২৫ ঘণ্টা।
যুক্তরাষ্ট্রে এই সময় পরিবর্তনকে সাধারণভাবে শরৎকালের সময় পরিবর্তন বলা হয়। বসন্তকালে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সন্ধ্যায় দিনের আলো বেশি সময় পাওয়া যায়। অন্যদিকে শরৎকালে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে সকালে সূর্যের আলো তুলনামূলক আগে পাওয়া যায়। তবে সন্ধ্যায় আগের তুলনায় দ্রুত অন্ধকার নেমে আসে।
দিবালোক সাশ্রয়ী সময় চালুর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দিনের আলোকে মানুষের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা। বিশেষ করে বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যায় বেশি সময় আলো থাকায় মানুষ কর্মস্থল থেকে ফেরার পর কেনাকাটা, খেলাধুলা, বিনোদন এবং অন্যান্য কাজের সুযোগ পান। তবে শীতের দিকে দিনের দৈর্ঘ্য স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকে। সময় পরিবর্তনের মাধ্যমে সূর্যের আলোর পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব নয়; কেবল ঘড়ির হিসাবে দিনের আলোর ব্যবহারকে পুনর্বিন্যাস করা হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সব এলাকায় এই পরিবর্তন কার্যকর হয়নি। হাওয়াই এবং অ্যারিজোনার অধিকাংশ এলাকায় সারা বছর একই সময় অনুসরণ করা হয়। অ্যারিজোনার নাভাহো জাতি অবশ্য দিবালোক সাশ্রয়ী সময় মেনে চলে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামোয়া, গুয়াম, উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ, পুয়ের্তো রিকো এবং ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জেও সাধারণত ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তন করা হয় না। ফলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় সময়ের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
এই সময় পরিবর্তনের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিমান চলাচল, ব্যবসায়িক বৈঠক, অনলাইন শিক্ষা এবং সংবাদ আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সময়ের ব্যবধান নতুন করে হিসাব করতে হয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সময়ের ব্যবধানও পরিবর্তিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের সময়ের ব্যবধান এখন ১১ ঘণ্টা। অন্যদিকে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ব্যবধান ১৪ ঘণ্টা। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের স্থানীয় সময় অনুযায়ী যোগাযোগের সময়সূচি সমন্বয় করতে হবে।
সময় পরিবর্তনের কারণে মানুষের ঘুমের অভ্যাসেও সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। যদিও অতিরিক্ত এক ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে, তারপরও সবার শরীর নতুন সময়ের সঙ্গে একইভাবে মানিয়ে নিতে পারে না। কারও ক্ষেত্রে সকালে আগে ঘুম ভেঙে যাওয়া, রাতে ঘুম আসতে দেরি হওয়া কিংবা দিনের বেলায় ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং রাতের পালায় কাজ করা কর্মীদের জন্য সময়সূচির এই পরিবর্তন কিছুটা বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখা এবং সকালে প্রাকৃতিক আলোতে কিছু সময় কাটানো শরীরকে নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুমের আগে অতিরিক্ত আলো ও মুঠোফোনের ব্যবহার কমানোও উপকারী।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দুইবার ঘড়ির কাঁটা পরিবর্তনের নিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। অনেক রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষ এই ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের যুক্তি, বছরে দুইবার সময় পরিবর্তন মানুষের ঘুম, কর্মজীবন এবং দৈনন্দিন অভ্যাসে অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন সৃষ্টি করে। অন্যদিকে দিবালোক সাশ্রয়ী সময়ের সমর্থকেরা মনে করেন, গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যায় বেশি সময় আলো পাওয়া ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের অবসর কাটানোর জন্য সুবিধাজনক।
এ বছরও বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আলোচনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিবালোক সাশ্রয়ী সময় সারা বছর চালু রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গত জুলাইয়ে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ৩০৮-১১৭ ভোটে পাস হয়েছিল। তবে সিনেটে প্রয়োজনীয় সমর্থন ও চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়ায় আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। রয়টার্সের ৩০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিনেটে এ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি না হওয়ায় চলতি বছরের সময় পরিবর্তনের নিয়ম বহাল থাকছে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১৪ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে আবার দিবালোক সাশ্রয়ী সময় শুরু হবে। সেদিন স্থানীয় সময় রাত দুইটায় ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে রাত তিনটা করা হবে। ফলে আবারও সন্ধ্যায় বেশি সময় দিনের আলো পাওয়া যাবে।
১ নভেম্বরের সময় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ এলাকায় প্রমিত সময় ফিরে এসেছে। এতে সকালের আলো আগে পাওয়া গেলেও সন্ধ্যায় দ্রুত অন্ধকার নামবে। অতিরিক্ত এক ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ তৈরি হলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং কর্মসূচিতে নতুন সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে হবে। আইন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রচলিত সময়ব্যবস্থাই কার্যকর থাকবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।