৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে উত্তাল পোশাকশিল্প, বিক্ষোভে বন্ধ বহু কারখানার উৎপাদন
মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আশুলিয়া, গাজীপুর ও ঢাকায় পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষে ব্যাহত হয়েছে কারখানার উৎপাদন।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। বেতন বৃদ্ধি, বকেয়া পাওনা পরিশোধ, চাকরির নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধের দাবিতে ঢাকা, সাভারের আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। আন্দোলনের জেরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন কারখানায় ছুটি ঘোষণা করায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল থেকে আশুলিয়ার বিভিন্ন পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁদের সঙ্গে আশপাশের কারখানার শ্রমিকেরাও যোগ দেন। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি, বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় বাড়লেও তাঁদের আয় সেই তুলনায় বাড়েনি। বর্তমান বেতনে সংসারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিক অতিরিক্ত সময় কাজ করেও পরিবারের খরচ সামাল দিতে পারছেন না। এ কারণে তাঁরা দ্রুত নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমানে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে এই মজুরি কাঠামো কার্যকর হয়। এর আগে সর্বনিম্ন মজুরি ছিল ৮ হাজার টাকা। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মজুরি যথেষ্ট নয়। তাই নতুন করে মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের প্রকৃত ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে।
আশুলিয়ার কাঠগড়া, জিরাবো, নিশ্চিন্তপুর, নরসিংহপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে কয়েকটি স্থানে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে আহত ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ভিন্নতা রয়েছে।
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আশুলিয়ায় প্রায় ৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে। এতে ওই এলাকার উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। শ্রমিকদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন আন্দোলনকারী।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকাতেও একই দাবিতে বিক্ষোভ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। চন্দ্রা ও পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার সড়কে শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। এতে কর্মস্থলগামী মানুষ, যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে ভোগান্তি দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে কয়েকটি কারখানায়ও ছুটি ঘোষণা করা হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কালিয়াকৈর এলাকায় প্রায় ১৮ থেকে ২০টি কারখানার কার্যক্রম বন্ধ বা ব্যাহত হয়।
রাজধানীর মিরপুরের বিভিন্ন এলাকাতেও শ্রমিকদের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১২ এলাকায় শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে কয়েকটি সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও কোথাও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।
শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। শনিবার মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি জানান, ১ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়া হবে। এ বিষয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন প্রকাশ এবং কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
মন্ত্রী শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়েও মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতি মাসের সাত তারিখের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হবে। এতে রপ্তানি আয় ও শিল্পের সামগ্রিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, শুধু মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নতুন বোর্ডে শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি বকেয়া বেতন পরিশোধ, চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। এই শিল্পে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে পোশাক খাত থেকে। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছাতে না পারলে দেশের পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও চাপে পড়তে পারে।
শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখাও জরুরি। এ জন্য সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর আলোচনা প্রয়োজন। শ্রমিকদের দাবি, নতুন মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের নতুন উদ্যোগ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি আলোচনার মাধ্যমে কীভাবে সমাধান করা হয়।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।