হ্যালোইনে কিশোরদের ঝামেলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের চার শহরে রাতের কারফিউ জারি
হ্যালোইন ঘিরে কিশোরদের বড় জমায়েত, সংঘর্ষ ও নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে কারফিউ এবং অতিরিক্ত পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইন উৎসবকে কেন্দ্র করে কিশোরদের বড় জমায়েত, সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন শহরে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর শনিবার হ্যালোইন উদ্যাপনের সময় একাধিক শহর ও পৌর কর্তৃপক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচলে সময়সীমা নির্ধারণ করে। পাশাপাশি পুলিশি টহল বৃদ্ধি, জনসমাগম পর্যবেক্ষণ এবং অভিভাবকদের সতর্ক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট নগর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ওক পার্ক, জর্জিয়ার কভিংটন, নিউ জার্সির লং ব্রাঞ্চ এবং নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ইয়ংকার্সসহ বিভিন্ন এলাকায় হ্যালোইন উপলক্ষে বিশেষ ব্যবস্থা কার্যকর ছিল। তবে এসব বিধিনিষেধ একই ধরনের ছিল না। কোথাও নির্দিষ্ট বয়সের কিশোরদের রাতে বাইরে থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, আবার কোথাও অভিভাবকের সঙ্গে থাকার সুযোগ রাখা হয়।
ইলিনয়ের ওক পার্কে গত বছরের হ্যালোইন উৎসবের অভিজ্ঞতা এবার বাড়তি সতর্কতার অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে। স্থানীয় পুলিশ বিভাগের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় আনুমানিক ৫০০ কিশোর জড়ো হয়েছিল। ওই জমায়েতের মধ্যে মারামারি ও গুলির শব্দ শোনা যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আশপাশের ছয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সহায়তা নিতে হয়েছিল।
এবার একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে ওক পার্ক পুলিশ বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যের সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুলিশপ্রধান শাতোনিয়া জনসন জানান, গত বছরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তাঁদের বিভাগ অতিরিক্ত প্রস্তুতি নিয়েছে। বড় জমায়েতের সম্ভাব্য স্থানগুলোতে নজরদারি এবং দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাও ছিল।
জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের কভিংটন শহরেও হ্যালোইন উপলক্ষে বিশেষ বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়। শহরের কেন্দ্রীয় ঐতিহাসিক বিনোদন এলাকায় ৩১ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা থেকে ১ নভেম্বর সকাল ৬টা পর্যন্ত ১৬ বছর ও তার কম বয়সীদের অভিভাবক বা অনুমোদিত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির তত্ত্বাবধান ছাড়া অবস্থান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। শহরের পরিষদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এই বিধিনিষেধ পুরো শহরের জন্য নয়; নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় এলাকার জন্য প্রযোজ্য ছিল।
নিউ জার্সির লং ব্রাঞ্চ শহরেও কঠোর অবস্থান নেয় পুলিশ। ১৭ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৩০ ও ৩১ অক্টোবর রাত ৮টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর পেছনে মে মাসে শহরের পিয়ার ভিলেজ এলাকায় সংঘটিত বিশৃঙ্খলার ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওই ঘটনায় বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হওয়ার পর মারামারি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ইয়ংকার্স শহরেও শিশু-কিশোরদের জন্য বয়সভিত্তিক সময়সীমা ঘোষণা করা হয়েছিল। নগর কর্তৃপক্ষের ২০ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১১ বছর বা তার কম বয়সীদের রাত ১০টার মধ্যে বাড়িতে ফিরতে বলা হয়। ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সীদের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয় রাত সাড়ে ১০টা এবং ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের জন্য রাত ১১টা। তবে অভিভাবক বা আইনগত অভিভাবকের সঙ্গে থাকলে নির্দিষ্ট ব্যতিক্রমের সুযোগ ছিল।
নিউইয়র্ক শহরের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। সেখানে হ্যালোইন উপলক্ষে পুরো শহরে নতুন কোনো বিশেষ কিশোর কারফিউ ঘোষণা করা হয়নি বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। বরং উৎসব নিরাপদ রাখতে বিভিন্ন সড়ক ও উন্মুক্ত স্থানে বিশেষ আয়োজন এবং যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ফলে ইয়ংকার্সের নিয়মকে নিউইয়র্ক শহরের নিয়ম হিসেবে প্রচার করা সঠিক হবে না।
শুধু কারফিউ নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আকস্মিক বড় জমায়েত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নগর কর্তৃপক্ষের। এসব জমায়েতকে অনেক সময় কিশোরদের গণজমায়েত বা দখলধর্মী সমাবেশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। নির্দিষ্ট স্থানে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী উপস্থিত হলে সেখানে যান চলাচল ব্যাহত হওয়া, মারামারি, সম্পত্তির ক্ষতি এবং পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরির আশঙ্কা থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি স্থান থেকে লোকজন ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে অন্য স্থানে আবার জমায়েত হওয়ার ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
উত্তর ক্যারোলাইনার র্যালি শহরেও তরুণদের বড় জমায়েত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। জুলাই মাসে শহরটির পুলিশ বিভাগ জানায়, ব্রিয়ার ক্রিক ও গ্লেনউড সাউথ এলাকায় দুটি বড় জমায়েতে আনুমানিক তিন হাজার এবং পাঁচ হাজারের বেশি তরুণ উপস্থিত হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোতে গুলিবর্ষণ, আহত হওয়া এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। এরপর অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধি তৈরির উদ্যোগ নেয় নগর কর্তৃপক্ষ।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কারফিউ দিয়ে কিশোরদের মধ্যে সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নিরাপদ বিনোদনের আয়োজন, অভিভাবকদের সচেতনতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সময়মতো নজরদারি বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
হ্যালোইন যুক্তরাষ্ট্রে শিশু-কিশোরদের কাছে আনন্দ ও বিনোদনের একটি জনপ্রিয় উৎসব। এদিন অনেকে বিশেষ পোশাক পরে ঘুরে বেড়ায়, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিষ্টি সংগ্রহ করে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক আনন্দ উদ্যাপনের সুযোগ বজায় রাখাও স্থানীয় প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২৬ সালের হ্যালোইন উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে নেওয়া পদক্ষেপ স্থানীয় পর্যায়ের নিরাপত্তা উদ্যোগেরই অংশ। এসব ব্যবস্থা দেশজুড়ে একক কোনো জাতীয় কারফিউ নয়; বরং প্রতিটি এলাকার নিজস্ব পরিস্থিতি, আগের বিশৃঙ্খলার অভিজ্ঞতা এবং জননিরাপত্তার প্রয়োজন বিবেচনা করে নেওয়া হয়েছিল।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।