নূহের নৌকার সন্ধানে তুরস্কে নতুন অভিযান, ভূগর্ভের ভিডিও ঘিরে চাঞ্চল্য
৯,৬৪৬ বার পড়া হয়েছে ৭ মিনিটে পড়ুন
তুরস্কের পূর্বাঞ্চলে আরারাত পর্বতের কাছাকাছি অবস্থিত রহস্যময় এক ভূপ্রাকৃতিক স্থাপনাকে ঘিরে আবারও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই স্থানটিকে ঘিরে একটি প্রশ্ন সামনে আসছে—এখানেই কি হাজার হাজার বছর আগে মহাপ্লাবনের সময় নূহের নৌকা এসে থেমেছিল? এবার সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নতুন করে অনুসন্ধান চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষক দল নোয়াস আর্ক স্ক্যানস। দলটি সম্প্রতি ভূগর্ভের ফাঁকা অংশের ভেতরে ধারণ করা একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, ভিডিওতে এমন কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে, যেগুলো তাদের ধারণা অনুযায়ী নৌকার সম্ভাব্য কাঠামোর কাছাকাছি অবস্থিত। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে কারণ গবেষকেরা এবার শুধু ওপর থেকে পাওয়া ছবি কিংবা ভূগর্ভের যন্ত্রের সংকেতের ওপর নির্ভর করছেন না। তাঁরা মাটির বিভিন্ন স্তর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোর উপাদান পরীক্ষা করার পরিকল্পনা করছেন। এর মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হবে, আলোচিত স্থানের ভেতরের মাটি ও বাইরের মাটির মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো পার্থক্য রয়েছে কি না। নোয়াস আর্ক স্ক্যানসের প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ড্রু জোন্স সংবাদমাধ্যম নিউজউইককে জানিয়েছেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমন একটি স্তরের সম্ভাব্য অস্তিত্ব দেখা গেছে, যা আশপাশের মাটির তুলনায় আলাদা হতে পারে। গবেষক দলের ধারণা, এই স্তরটি কোনো সম্ভাব্য বাইরের আবরণ বা নৌকার কাঠামোর অংশ হতে পারে। তবে সেটি আসলে কী দিয়ে তৈরি, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ কারণেই ওই এলাকায় গর্ত করে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গবেষক দলের প্রকাশিত ভিডিওতে ভূগর্ভের ফাঁকা অংশের ভেতরে ক্যামেরা প্রবেশ করিয়ে ধারণ করা দৃশ্য দেখানো হয়েছে। সেখানে পানির উপস্থিতিও দেখা যায়। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, আগে পরিচালিত ভূগর্ভস্থ অনুসন্ধানে এমন কিছু রেখা ও স্তরের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল, যেগুলো নৌকার বাইরের আকৃতির সঙ্গে মিলে যেতে পারে। তাদের ধারণা, মাটির নিচে একটি আলাদা স্তর থাকতে পারে, যার ভেতরে ও বাইরে কাদা বা মাটি জমে রয়েছে। যদি পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে স্তরটি আশপাশের মাটি থেকে ভিন্ন কোনো উপাদানে তৈরি, তাহলে সেটি গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হতে পারে। তবে ভিডিওতে পানি দেখা গেলেই সেখানে কোনো প্রাচীন নৌকা রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ভূগর্ভে পানির উপস্থিতির স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক কারণ থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শক্ত বা কম পানি চলাচলকারী মাটির স্তরের কারণে ভূগর্ভে পানি আটকে থাকতে পারে। ফলে পানির অবস্থান, মাটির গঠন এবং স্তরগুলোর বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা না করে সেটিকে নৌকার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হবে না। গবেষকদের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বিভিন্ন গভীরতা থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করা। এসব নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে রাসায়নিক ও ভৌত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হবে। তাঁরা জানতে চান, সন্দেহজনক স্তরটি সাধারণ পাথর, কাদা, খনিজ পদার্থ, প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা কোনো উপাদান, নাকি মানুষের তৈরি কোনো প্রাচীন কাঠামোর অবশিষ্টাংশ। পরীক্ষার ফলাফল আগের ভূগর্ভস্থ জরিপের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।
এই অনুসন্ধানের কেন্দ্রস্থল দুরুপিনার ভূগঠন। এটি তুরস্কের আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকার কাছে অবস্থিত। আরারাত পর্বতের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত এই ভূপ্রাকৃতিক স্থাপনাটি ওপর থেকে দেখতে অনেকটা নৌকার মতো। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫৭ মিটার বা ৫১৫ ফুট বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৫৯ সালে তুরস্কের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে তোলা একটি ছবিতে এই অস্বাভাবিক আকৃতির ভূখণ্ড শনাক্ত করেন। এরপর থেকেই স্থানটি নূহের নৌকার সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, মহাপ্লাবনের সময় নূহের নৌকা মানুষ ও প্রাণীদের রক্ষা করেছিল। বাইবেলের আদিপুস্তকের বিবরণে আরারাতের পর্বতমালায় নৌকাটি থেমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই বর্ণনার সঙ্গে তুরস্কের আরারাত অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানের মিল থাকায় অনেক ধর্মীয় গবেষক ও অনুসন্ধানী দল দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় নৌকার অস্তিত্ব খুঁজে আসছেন। তবে ধর্মীয় বর্ণনার সঙ্গে কোনো স্থানের ভৌগোলিক মিল থাকলেই সেটি ঐতিহাসিকভাবে নৌকার অবস্থান প্রমাণ করে না। দুরুপিনার এলাকায় গত কয়েক দশকে বিভিন্ন ধরনের অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাটির নিচে বস্তু শনাক্ত করার জন্য রাডার প্রযুক্তি, ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য পরিমাপ, আকাশ থেকে ভূমির ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি এবং মাটির নমুনা পরীক্ষা। নোয়াস আর্ক স্ক্যানসের দাবি, আগের কয়েকটি জরিপে মাটির নিচে কিছু সরলরেখা, কোণ এবং কক্ষের মতো আকৃতির সংকেত পাওয়া গেছে। তাদের মতে, এসব সংকেত আরও গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে। ২০২৬ সালে এই গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। দলটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক জেনকার আতিলার নেতৃত্বে একটি গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে নোয়াস আর্ক স্ক্যানসের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে ভূতাত্ত্বিক ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ যুক্ত রয়েছেন। তুরস্কের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে গবেষণা পরিচালনার কথাও দলটি জানিয়েছে। গবেষণায় ভূমির ওপরের ছবি, ভূগর্ভের মানচিত্র, মাটির নমুনা এবং পরীক্ষাগারের তথ্য একত্র করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই গবেষণার ফলাফল নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে একমত অবস্থান নেই। অনেক ভূতাত্ত্বিক মনে করেন, নৌকার মতো দেখতে হওয়া মানেই কোনো স্থাপনা মানুষের তৈরি নয়। প্রকৃতির বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় এমন আকৃতির ভূমি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস, পাথরের স্তর সরে যাওয়া, ক্ষয় এবং দীর্ঘদিনের প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে অস্বাভাবিক আকৃতির ভূখণ্ড তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়। ১৯৯৬ সালে ভূতাত্ত্বিক লরেন্স কলিন্স ও ডেভিড ফ্যাসোল্ডের প্রকাশিত একটি গবেষণায় দুরুপিনার স্থাপনাকে নূহের নৌকা হিসেবে চিহ্নিত করার দাবির বিরোধিতা করা হয়। তাঁদের গবেষণায় বলা হয়, সেখানে নৌকার কাঠামো হিসেবে দেখানো কিছু বস্তু আসলে প্রাকৃতিক খনিজ ও পাথরের গঠন। তাঁরা ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্থাপনাটিকে প্রাকৃতিক কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। এরপর ২০০৭ সালে ভূতাত্ত্বিক মুরাত আভজির আরেকটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। প্রকৌশল ভূতত্ত্ববিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়, নৌকার মতো দেখতে এই ভূখণ্ডটি মায়োসিন যুগের চুনাপাথরের একটি বড় অংশ হতে পারে। দুর্বল কাদামাটির স্তরের ওপর দিয়ে পাথরের অংশটি নিচের দিকে সরে যাওয়া, ভূমিপ্রবাহ এবং বরফ গলার পানির ক্ষয়ের কারণে এর বর্তমান আকৃতি তৈরি হয়েছে বলে গবেষক ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ এই গবেষণাও স্থানটিকে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। এখানেই বর্তমান অনুসন্ধানের গুরুত্ব। আগের গবেষণাগুলোতে স্থানটির আকৃতি ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু নতুন দলটি দাবি করছে, তারা ভূগর্ভের বিভিন্ন স্তর থেকে সরাসরি নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোর গঠন পরীক্ষা করতে চায়। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে শুধু যন্ত্রের মাধ্যমে পাওয়া সংকেতের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব নমুনার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা। তবে এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংবাদমাধ্যম নিউজউইক জানিয়েছে, তারা গবেষক দলের ভূগর্ভস্থ জরিপের মূল তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। দলটির ব্যাখ্যাও এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি। অর্থাৎ ভিডিও প্রকাশ, গর্ত খনন কিংবা মাটির নিচে আলাদা স্তরের সম্ভাব্য উপস্থিতি—কোনোটিই নূহের নৌকার অস্তিত্ব প্রমাণ করে না।
পরবর্তী সময়ে গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে। গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্সের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের অনুসন্ধানের বিস্তারিত প্রতিবেদন আগামী বছরের এপ্রিল অথবা মে মাসে প্রকাশের লক্ষ্য রয়েছে। সেই প্রতিবেদনে নমুনা পরীক্ষার ফলাফল, ভূগর্ভস্থ স্তরের গঠন এবং আগের জরিপের সঙ্গে নতুন তথ্যের তুলনা তুলে ধরার কথা রয়েছে। নূহের নৌকা নিয়ে অনুসন্ধান নতুন কিছু নয়। বহু বছর ধরে বিভিন্ন দেশের গবেষক, ধর্মীয় অনুসন্ধানী এবং ইতিহাসপ্রেমীরা সম্ভাব্য অবস্থান খুঁজেছেন। কিন্তু কোনো অনুসন্ধানেই এখন পর্যন্ত এমন সর্বজনস্বীকৃত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে দুরুপিনার ভূগঠনের ভেতরে নূহের নৌকা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু নৌকার মতো আকৃতি কিংবা মাটির নিচে অস্বাভাবিক রেখা পাওয়া যথেষ্ট নয়। সেখানে মানুষের তৈরি কাঠামোর সুস্পষ্ট চিহ্ন, শনাক্তযোগ্য নির্মাণসামগ্রী, বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারিত বয়স এবং স্বাধীন গবেষকদের দ্বারা যাচাই করা পরীক্ষার ফলাফল প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রাচীন কাঠের সন্ধান পাওয়া গেলে সেটির প্রজাতি, বয়স এবং মানুষের ব্যবহারের চিহ্ন পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। সব মিলিয়ে, তুরস্কের দুরুপিনার এলাকায় নতুন ভিডিও প্রকাশ নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিনের রহস্যকে আবার আলোচনায় এনেছে। গবেষকেরা এবার মাটির নিচের স্তর পরীক্ষা করে তাঁদের ধারণার পক্ষে বাস্তব প্রমাণ খুঁজতে চাইছেন। কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে এই স্থানকে নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ হিসেবে ঘোষণা করার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আপাতত এটি একটি বিতর্কিত ভূতাত্ত্বিক স্থাপনা এবং চলমান গবেষণার বিষয়।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।