ব্রঙ্কসে ১২ বছরের শিশুকে গুলি, তিন সপ্তাহ পর গ্রেপ্তার ২৬ বছরের যুবক
৯,৬৫৬ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরের ব্রঙ্কসে ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে গুলি করার ঘটনায় ডেস্টিন বার্জেস নামে ২৬ বছর বয়সী এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় জড়িত আরও তিনজন এখনো পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ টুয়েলভ। ঘটনাটি ঘটে ব্রঙ্কসের ওয়েস্টচেস্টার স্কয়ার এলাকায় অবস্থিত পার্লি গেটস পার্কের কাছে। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির সময় নিরীহ পথচারী হিসেবে উপস্থিত থাকা ১২ বছর বয়সী শিশুটি গুলিবিদ্ধ হয়। শিশুটির শরীরে একাধিক গুলি লাগে। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার শরীর থেকে দুটি গুলি বের করা হয়। ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দা ও শিশুটির পরিবারের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেস্টিন বার্জেস ব্রঙ্কসের বাসিন্দা। মঙ্গলবার দুপুরের কিছু আগে তাকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তদন্ত চালানোর পর তার বিরুদ্ধে এই গ্রেপ্তারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের তথ্যের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, শিশুটিকে গুলিবিদ্ধ করার ঘটনায় বার্জেসের কথিত ভূমিকার অভিযোগেই তাকে আটক করা হয়েছে। তবে ঘটনার তারিখ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া কয়েকটি প্রতিবেদনে ১০ অক্টোবরের কথা উল্লেখ করা হলেও পরবর্তী বিস্তারিত প্রতিবেদন এবং ঘটনাটির সময়কার সংবাদে ১২ অক্টোবর সোমবার রাতের কথা বলা হয়েছে। তাই ঘটনার তারিখ হিসেবে ১২ অক্টোবর উল্লেখ করাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য। একইভাবে ঘটনাস্থলকে ট্র্যাটম্যান অ্যাভিনিউ ও রোল্যান্ড স্ট্রিটের কাছাকাছি পার্লি গেটস পার্ক এলাকা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
ঘটনার সময় রাত আনুমানিক ৮টা ২০ থেকে ৮টা ৩০ মিনিটের মধ্যে। পুলিশ ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং আগ্নেয়াস্ত্র বের করে গুলি চালানো শুরু হয়। একাধিক গুলির শব্দে আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গোলাগুলির মধ্যে পড়ে শিশুটি গুরুতরভাবে আহত হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে নিউজ টুয়েলভ জানিয়েছে, বার্জেসের সঙ্গে আরও তিনজন পুরুষ ওই গোলাগুলিতে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গোলাগুলির আগে তারা কথিতভাবে একটি গোষ্ঠীর নাম ধরে চিৎকার করেছিলেন এবং গোষ্ঠীটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাতের ইশারা করেছিলেন। এরপর তারা গুলি চালান বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতে কী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তা এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি। পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব তথ্যকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর শিশুটিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। সিবিএস নিউইয়র্কের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাছাকাছি থাকা কয়েকজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শিশুটিকে সহায়তা করেন। পরে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে তাকে মন্টিফিওর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়।
প্রাথমিক চিকিৎসার সময় শিশুটির অবস্থা গুরুতর হলেও পরে তাকে স্থিতিশীল বলে জানানো হয়েছিল। তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছিলেন, শিশুটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিল। তবে গুলির আঘাতের কারণে সে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেও কিছুটা সমস্যায় পড়ছিল। চিকিৎসকেরা তার শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখছিলেন। শিশুটির পরিবারের জন্য ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। পরিবারের সদস্যরা জানান, শিশুটি কোনো সংঘর্ষে অংশ নেয়নি। সে ছিল সাধারণ পথচারী। কিন্তু অন্যদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় তাকে গুলিবিদ্ধ হতে হয়েছে। একটি শিশুর এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া পরিবারটির জন্য গভীর মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে সিবিএস নিউইয়র্ককে দেওয়া বক্তব্যে শিশুটির বোন মিরাল আলামৌরি জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর শিশুটির কাছ থেকে ফোন পেয়ে পরিবারের সবাই হতবাক হয়ে যান। এমন ঘটনা তাদের জীবনে ঘটতে পারে, তা তারা কখনো কল্পনাও করেননি। পরিবারের সদস্যরা শিশুটির পাশে থাকার এবং সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার কথা জানান। ঘটনার পরপরই পুলিশ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে আশপাশের নিরাপত্তা ক্যামেরার ধারণ করা ভিডিও সংগ্রহ করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হয়। সিবিএস নিউইয়র্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার পর তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল থেকে সাতটি গুলির খোসা উদ্ধার করেন। আশপাশের একটি বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিওতেও গোলাগুলির সময় আলোর ঝলক দেখা গিয়েছিল।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ সন্দেহ করেছিল, গোলাগুলিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্য এবং নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলে। ঘটনার কয়েক দিন পরও কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পরে তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে ৩ নভেম্বর ডেস্টিন বার্জেসকে আটক করা হয়। বার্জেসের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে গ্রেপ্তার হওয়া মানেই কোনো ব্যক্তি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন নয়। অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি আইন অনুযায়ী নিজের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন। এদিকে এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও তিনজনের সন্ধান করছে পুলিশ। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা পলাতক ছিলেন বলে নিউজ টুয়েলভ জানিয়েছে। তাদের পরিচয়, অবস্থান কিংবা গ্রেপ্তারের সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তকারীরা তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশ সাধারণ মানুষের কাছেও সহযোগিতা চেয়েছে। ঘটনার বিষয়ে কারও কাছে ভিডিও, ছবি, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য কিংবা সন্দেহভাজনদের সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে তা পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের অপরাধ দমন সহায়তা নম্বর ১-৮০০-৫৭৭-৮৪৭৭-এ যোগাযোগ করে তথ্য দেওয়া যাবে। তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রাখার ব্যবস্থাও রয়েছে। ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক নগরের পাঁচটি প্রধান প্রশাসনিক এলাকার একটি। এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও অভিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। ওয়েস্টচেস্টার স্কয়ার এলাকাটি আবাসিক জনবসতি, পার্ক ও স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচিত। এমন একটি জনবহুল এলাকায় শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। পার্কে যাওয়া, রাস্তায় হাঁটা কিংবা বাড়ির আশপাশে খেলাধুলা করা শিশুদের জন্য স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ। কিন্তু এ ধরনের গোলাগুলির ঘটনায় নিরপরাধ মানুষও সহজেই প্রাণঘাতী বিপদের মুখে পড়তে পারেন। এই ঘটনায় শিশুটি কোনো পক্ষের বিরোধের সঙ্গে জড়িত না থেকেও গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সিবিএস নিউইয়র্ককে দেওয়া বক্তব্যে এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এমন ঘটনা তাদের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের নিয়ে বাইরে বের হওয়ার সময় অভিভাবকদের আরও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। তবে এই গোলাগুলির প্রকৃত কারণ কী ছিল, কারা প্রথম গুলি চালিয়েছিল এবং অভিযুক্তদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত কোথায়—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। পুলিশের তদন্তে এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়ার কথা। একই সঙ্গে পলাতক তিনজনকে গ্রেপ্তার করা গেলে ঘটনার বিষয়ে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডেস্টিন বার্জেস পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। শিশুটি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় আরও তিনজনের সন্ধান চলছে। শিশুটির চিকিৎসার পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কেও নতুন কোনো বিস্তারিত সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। পুরো ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
নিউইয়র্কের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ব্যক্তিগত বিরোধ কিংবা সংঘর্ষে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করলে তার শিকার হতে পারেন সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষ। বিশেষ করে শিশুদের জীবন এমন সহিংসতার ঝুঁকিতে পড়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি শিশুটির পরিবারও অপেক্ষা করছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে কি না এবং শিশুটি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে কি না।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।