স্প্যাংলের গুলিতে তিনজন নিহত, প্রাণসংকটে দুই পুলিশ সদস্য, আহত আরও একজন
৮,৬৫৮ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেন কাউন্টিতে পারিবারিক সহিংসতার একটি ঘটনা ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হামলাকারীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন স্পোকেন কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ের দুই পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ এক নারীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তবে তাঁর আঘাত প্রাণঘাতী নয় বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর বিকেলে স্প্যাংল এলাকার একটি বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ স্পোকেন কাউন্টির একটি গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগে পুলিশ সেখানে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। স্পোকেন কাউন্টি শেরিফ জন নওয়েলস মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, এ ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে হামলাকারীও রয়েছেন। একই ঘটনায় তাঁর বিভাগের দুই কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় মঙ্গলবার দুপুরে। পুলিশ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে স্প্যাংল এলাকার সাউথ স্মাইথ রোডের ১৮৭০০ নম্বর ব্লকের একটি বাড়িতে পারিবারিক সহিংসতার খবর পেয়ে পুলিশ সদস্যরা সেখানে যান। পুলিশের কাছে খবর আসে, এক নারী তাঁর প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি জানান, তাঁর ভাই তাঁকে গুলি করেছেন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ওই নারী প্রতিবেশীর কাছে সাহায্য চান এবং চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা জানান।
পুলিশি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই নারী আরও জানান, বাড়ির ভেতরে অন্য ব্যক্তিরাও রয়েছেন এবং তাঁদের জীবন বিপদের মধ্যে থাকতে পারে। ফলে পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে শুধু একজন আহত ব্যক্তির চিকিৎসার বিষয় হিসেবে দেখেননি। বাড়ির ভেতরে আরও কেউ বিপদের মধ্যে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ জানতে পারে, সন্দেহভাজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগে থেকেই গ্রেপ্তারের একটি গুরুতর অপরাধসংক্রান্ত পরোয়ানা ছিল। তাঁর কাছে আরও আগ্নেয়াস্ত্র থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছিল। পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় স্পোকেন কাউন্টি পুলিশের বিশেষ অস্ত্র ও কৌশলগত দলকে ঘটনাস্থলে ডাকা হয়। একই সঙ্গে বাড়ির ভেতরে কেউ জীবিত অবস্থায় আটকে আছেন কি না, তা জানতে আকাশে চালিত দূরনিয়ন্ত্রিত ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। এই ক্যামেরার মাধ্যমে বাড়ির আঙিনায় একজনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে পুলিশ সদস্যরা ওই ব্যক্তির কাছে গিয়ে নিশ্চিত হন, তিনি মারা গেছেন। পুলিশ প্রথমে ওই ব্যক্তিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় বাড়ির ভেতরেও আরও মানুষ থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও বিশেষ কৌশলগত দলের সদস্যরা বাড়ির দিকে এগিয়ে যান। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল প্রায় ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে কর্মকর্তারা বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি জরুরি হওয়ায় সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের উদ্ধারের উদ্দেশ্যে তাঁরা আদালতের পরোয়ানা ছাড়াই জরুরি ভিত্তিতে বাড়িতে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বাড়ির কাছে পৌঁছানোর পর ভেতর থেকে তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে দুই পুলিশ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। তাঁদের শরীরে প্রাণঘাতী আঘাত লাগে বলে জানান শেরিফ জন নওয়েলস।
অন্য পুলিশ সদস্যরা পাল্টা গুলি চালান। একই সঙ্গে তাঁরা আহত দুই সহকর্মীকে গুলির ঝুঁকি থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ঘটনাস্থলেই তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। আহত দুই কর্মকর্তার অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য আকাশপথে জরুরি চিকিৎসা পরিবহনের ব্যবস্থাও করা হয়। পরে তাঁদের স্পোকেন শহরের প্রভিডেন্স সেক্রেড হার্ট মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। একজনকে পুলিশি গাড়িতে এবং অন্যজনকে আকাশপথে হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শেরিফ জন নওয়েলস জানান, আহত দুই কর্মকর্তাই তাঁর বিভাগের বিশেষ কৌশলগত দলের সদস্য। তাঁদের দুজনেরই পরিবার রয়েছে এবং প্রত্যেকের দুটি করে ছোট সন্তান আছে। সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের পরিবারের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তিনি বলেন, এটি স্পোকেন কাউন্টির জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি দিন। এই ঘটনার কারণে অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহত কর্মকর্তারা অন্যদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে নিজেরাই গুরুতর বিপদের মুখে পড়েছেন। এদিকে বাড়ির ভেতরে অবস্থান করা সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিজেকে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন বলে ধারণা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পোকেন শহরের বিশেষ কৌশলগত পুলিশ দল এবং প্রতিবেশী আইডাহো অঙ্গরাজ্যের কুটেনাই কাউন্টির বিশেষ দলকেও সহায়তার জন্য ডাকা হয়। পরবর্তী সময়ে বাড়ির ভেতরে আরও একজনের মরদেহ পাওয়া যায়। সন্দেহভাজন ব্যক্তিও মারা গেছেন বলে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে। এভাবে বাড়ির বাইরে পাওয়া একজন, বাড়ির ভেতরে পাওয়া আরেকজন এবং সন্দেহভাজন হামলাকারীসহ মোট তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
তবে সন্দেহভাজন ব্যক্তির মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, সে বিষয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদনগুলোতে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন, নাকি অন্য কোনোভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা তদন্তের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া নারীকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁর আঘাত গুরুতর না হলেও চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাঁর অবস্থা প্রাণঘাতী নয়। ঘটনার পর আহত পুলিশ সদস্যদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সুবিধার্থে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের মহাসড়ক পুলিশ এবং স্থানীয় সংস্থাগুলো আন্তঃরাজ্য মহাসড়ক ৯০ ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৫ নম্বর সড়কের কিছু অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। জরুরি চিকিৎসা পরিবহন নির্বিঘ্ন করতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশি সূত্র অনুযায়ী, স্পোকেন কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ের যেসব সদস্য এ ঘটনায় গুলি চালিয়েছিলেন, তাঁদের তিনজনকে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে।
এ তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে স্পোকেন শহরের পুলিশ বিভাগ এবং ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের মহাসড়ক পুলিশ। ঘটনার প্রকৃত কারণ, গুলিবর্ষণের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর সাধারণ মানুষের জন্য আর কোনো তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাঝুঁকি নেই। তবে তদন্তের স্বার্থে নিহত ব্যক্তি, সন্দেহভাজন হামলাকারী এবং আহত পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি এবং এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে একটি পারিবারিক বিরোধের খবর কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে, তা এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একজন নারীর সাহায্যের আবেদন থেকেই পুরো ঘটনার সূত্রপাত। তাঁকে উদ্ধার এবং বাড়ির ভেতরে থাকা সম্ভাব্য অন্য ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়েই পুলিশ সদস্যরা গুলির মুখে পড়েন। তবে কেন ওই বাড়িতে সহিংসতা শুরু হয়েছিল, হামলাকারীর সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরোধের প্রকৃত কারণ কী ছিল এবং ঘটনার আগে সেখানে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা তিন এবং দুই পুলিশ কর্মকর্তা গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহত নারীও চিকিৎসা পেয়েছেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার সব দিক সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তদন্তকারী সংস্থাগুলো পরবর্তী সময়ে নতুন তথ্য প্রকাশ করলে নিহতদের পরিচয়, হামলার কারণ এবং পুলিশের গুলিবর্ষণসংক্রান্ত বিস্তারিত পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।