তেলের বৈশ্বিক সংকট ঠেকাতে আমিরাতের সঙ্গে বড় চুক্তির পথে ফিলিপাইন
বিশ্ববাজারে তেলের দামের অস্থিরতা মোকাবিলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহযোগিতায় কৌশলগত তেল সংরক্ষণাগার গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ফিলিপাইন, লক্ষ্য ২০২৭ সাল নির্ধারণ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকি মোকাবিলায় কৌশলগত তেল সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে ফিলিপাইন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে দেশটি। ২০২৭ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রস্তাবিত প্রকল্পটির প্রাথমিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গালফ নিউজের ২ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে ফিলিপাইনের সিনেটের জ্বালানি কমিটির চেয়ারম্যান এরউইন তুলফো দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তেল সংরক্ষণাগার নির্মাণ, অপরিশোধিত তেল সরবরাহ এবং দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনার আওতায় ফিলিপাইনে একটি কৌশলগত তেল সংরক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে। সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠানটি তেল মজুত রাখতে পারবে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে ফিলিপাইনের জ্বালানি চাহিদা পূরণে ওই মজুত ব্যবহারের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে এ ধরনের অগ্রাধিকারমূলক সরবরাহের শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বৈঠকে ২০২৭ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রকল্পটির প্রাথমিক কার্যক্রম শুরুর সম্ভাব্য সময়সীমা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে বিদ্যমান তেল সংরক্ষণ চুক্তির একটি কাঠামো ফিলিপাইন সরকারকে পর্যালোচনার জন্য দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে। এর মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্যিক ও কারিগরি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া সহজ হতে পারে।
তবে এখনো প্রকল্পটির চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর, বিনিয়োগের পরিমাণ, সংরক্ষণাগারের নির্দিষ্ট স্থান কিংবা নির্মাণকাজের পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি নিশ্চিত হয়নি। ফলে ২০২৭ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিককে প্রকল্পের সম্ভাব্য প্রাথমিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য হিসেবে দেখতে হবে, নিশ্চিত উদ্বোধনের তারিখ হিসেবে নয়।
ফিলিপাইনের জন্য এ উদ্যোগের গুরুত্ব অনেক বেশি। দেশটি জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে দেশটির আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব পড়ে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বড় উদ্বেগ। এমন পরিস্থিতিতে পর্যাপ্ত তেল মজুত থাকলে নতুন চালান আসতে দেরি হলেও সাময়িকভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়। একই সঙ্গে হঠাৎ করে বেশি দামে তেল কেনার চাপও কিছুটা কমানো যায়।
রয়টার্সের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিলিপাইন নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক দেশের সঙ্গে তেল সরবরাহ ও সংরক্ষণসংক্রান্ত সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করছে। এসব দেশের মধ্যে সৌদি আরব, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অস্ট্রেলিয়ার নাম রয়েছে। এর মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট দেশ বা সরবরাহপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎস তৈরির চেষ্টা করছে দেশটি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফিলিপাইনের বিদ্যমান জ্বালানি মজুত দিয়ে প্রায় ৫৫ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। দেশটি ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে ৬০ দিনের মজুত গড়ে তুলতে চায়। এ লক্ষ্যে বেসরকারি সংরক্ষণাগার ব্যবহারের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে নতুন তেল সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ফিলিপাইনের জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বাতান অঞ্চল বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সেখানে সরকারি উদ্যোগে কৌশলগত তেল সংরক্ষণ ট্যাংক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও দেশটিতে তেল সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে ফিলিপাইন ভবিষ্যতে আঞ্চলিক তেল সংরক্ষণ ও সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
তবে শুধু তেল সংরক্ষণাগার নির্মাণ করলেই জ্বালানির দাম কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, পরিবহন ব্যয়, কর, মুদ্রার বিনিময় হার এবং অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার ওপরও জ্বালানির দাম নির্ভর করে। সংরক্ষণাগার মূলত জরুরি পরিস্থিতিতে সরবরাহ সচল রাখা এবং আকস্মিক সংকটের প্রভাব কমানোর ক্ষেত্রে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞদের বিবেচনায়, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তেলের মালিকানা, জরুরি সময়ে মজুত ব্যবহারের অধিকার, বিনিয়োগের শর্ত এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বিদেশি প্রতিষ্ঠান তেল মজুত করলেও সংকটের সময় ফিলিপাইন কত দ্রুত সেই তেল ব্যবহার করতে পারবে, তা চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ফিলিপাইনের প্রস্তাবিত অংশীদারত্ব দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে প্রকল্পটি এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তি, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেই এর বাস্তব অগ্রগতি স্পষ্ট হবে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতার মধ্যে নিজেদের জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখা এবং আঞ্চলিক তেল সংরক্ষণকেন্দ্র হিসেবে অবস্থান শক্তিশালী করাই এখন ফিলিপাইনের প্রধান লক্ষ্য।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।