পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর পথ খুলল, নতুন বোর্ড গঠন করে গেজেট প্রকাশ সরকারের
পোশাক শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের বোর্ড গঠন করেছে সরকার, গেজেট প্রকাশের পর শুরু হবে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের লক্ষ্যে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গত ১ নভেম্বর পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। পরে প্রজ্ঞাপন দুটি সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। নতুন এই বোর্ড গঠনের মধ্য দিয়ে পোশাকশ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি বৃদ্ধির দাবি এবং সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নতুন বেতনকাঠামো নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলো।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন মজুরি বোর্ডে মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির পরিচালক এবিএম সামছুদ্দিন। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
অন্য প্রজ্ঞাপনে নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। মালিকপক্ষের আরেক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব। শ্রমিকপক্ষের আরেক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সংশোধিত ২০২৬ সালের বিধান অনুসারে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বোর্ডকে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। বোর্ডের চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত, শিল্পের আর্থিক সামর্থ্য এবং শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশ তৈরির কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বোর্ড গঠন ও গেজেট প্রকাশের অর্থ এই নয় যে শ্রমিকদের নতুন বেতন ইতিমধ্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে। নতুন মজুরির পরিমাণ, কোন তারিখ থেকে তা কার্যকর হবে এবং বিভিন্ন গ্রেডে কত টাকা নির্ধারিত হবে, সেসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। বোর্ডের সুপারিশ এবং সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের পরই নতুন মজুরির কাঠামো সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে অসন্তোষ ও আন্দোলন তীব্র হয়েছে। রয়টার্সের ১ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের একটি অংশ মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়েছে। দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, যাতায়াত এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান আয় দিয়ে জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে শ্রমিকদের বক্তব্য।
শ্রমিকদের দাবি, দীর্ঘ সময় কাজ করেও অনেকের পক্ষে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে বসবাসকারী শ্রমিকদের জন্য বাসাভাড়া, খাবার এবং যাতায়াতের ব্যয় বড় চাপ তৈরি করেছে। তাঁদের মতে, মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যয় নয়, শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ৫২৯টি কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল এবং প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ শ্রমিক কাজ করতে পারেননি বলে মালিকপক্ষের সংগঠনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। তবে এসব সংখ্যা সংশ্লিষ্ট পক্ষের দেওয়া তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২ নভেম্বর রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে জানানো হয়, আগের দিনের অস্থিরতার পর অনেক পোশাক কারখানা আবার খুলেছে। তবে শ্রমিকদের অসন্তোষ পুরোপুরি দূর হয়নি এবং নতুন করে বিক্ষোভের আশঙ্কা রয়েছে। কারখানা বন্ধ থাকলে রপ্তানি কার্যক্রম, শ্রমিকদের আয় এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের সময়সূচি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে পোশাক খাত থেকে। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
মালিকপক্ষের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎসংকট এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে শিল্পের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনার পাশাপাশি কারখানাগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও রপ্তানি বাজারের বাস্তবতাও দেখতে হবে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, নিম্নতম মজুরি বোর্ড শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, জীবনযাত্রার মান, উৎপাদন ব্যয়, উৎপাদনশীলতা, পণ্যের মূল্য, মূল্যস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি এবং শিল্পের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করে মজুরি সুপারিশ করে। আইনের ১৩৯ ধারায় বোর্ডের সুপারিশের বিধান রয়েছে। সরকার সেই সুপারিশ বিবেচনা করে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে চূড়ান্ত মজুরি ঘোষণা করতে পারে।
আইন অনুযায়ী, সরকার নির্দেশ দেওয়ার পর বোর্ডকে সাধারণত ছয় মাসের মধ্যে সুপারিশ জমা দিতে হয়। তবে বোর্ডের অনুরোধে সরকার এই সময় বাড়াতে পারে। তাই নতুন বোর্ডের কার্যক্রম, আলোচনা এবং সুপারিশ তৈরির সময়সীমা শ্রমিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রত্যাশা, তাঁদের প্রস্তাব ও বাস্তব অভিজ্ঞতা যেন যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে মালিকপক্ষের আর্থিক তথ্য এবং শিল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শুধু বেতন নির্ধারণ নয়, নির্ধারিত মজুরি সময়মতো পরিশোধ, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক, কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন মজুরি বোর্ড গঠন পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদক্ষেপ। তবে শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, তা নির্ভর করবে বোর্ডের সুপারিশ এবং সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। এখন শ্রমিক, মালিক ও সংশ্লিষ্ট মহলের নজর নতুন মজুরি নির্ধারণের পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।