মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপে যুক্তরাষ্ট্রের লাখো ভোটার, বাড়ছে রাজনৈতিক ক্ষোভ
খাবার, ওষুধ, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন মার্কিন শ্রমজীবীরা; ভোটের আগে জীবনযাত্রার সংকটই হয়ে উঠেছে প্রধান রাজনৈতিক প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে দেশটির লাখ লাখ ভোটারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। খাদ্যপণ্য, বাড়িভাড়া, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যবিমা এবং চিকিৎসার খরচ যেভাবে বেড়েছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না সাধারণ মানুষের আয়। ফলে ভালোভাবে বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খাচ্ছেন দেশটির শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। অনেকের জন্য পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পরিবারের খাবার কেনা এবং নিজেদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহের মধ্যে একটি বেছে নিতে হচ্ছে।
১ নভেম্বর প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের শ্রমিক, শ্রমিক সংগঠনের নেতা এবং সাধারণ ভোটারদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক সংকটও ভোটের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে যেসব প্রার্থী শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তাঁদের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে অনেক ভোটারের।
ওহাইও অঙ্গরাজ্যের লরেইন কাউন্টির পরিস্থিতি এই অর্থনৈতিক সংকটের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সেখানে কাউন্টির পরিবার ও জনকল্যাণবিষয়ক সেবা বিভাগের কর্মীরা ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ধর্মঘট পালন করছেন। কর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের বেতন জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় যথেষ্ট বাড়েনি। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিমার খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের প্রকৃত আয় আরও কমে যাচ্ছে।
ধর্মঘটের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক নেত্রী জিনা জোনস জানান, তাঁদের পরিবারের স্বাস্থ্যবিমার মাসিক খরচ আগে ছিল ৩৫ ডলার। একই সুবিধার জন্য আগামী জানুয়ারি থেকে তা বেড়ে ৬০০ ডলারে পৌঁছানোর কথা। অর্থাৎ মাসিক ব্যয় এক ধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। কর্মীদের প্রারম্ভিক ঘণ্টাপ্রতি মজুরি প্রায় ১৫ ডলার হওয়ায় এই অতিরিক্ত ব্যয় তাঁদের পারিবারিক বাজেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
জিনা জোনসের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যবিমার খরচ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক কর্মী আগের তুলনায় কম অর্থ হাতে পাচ্ছেন। তাঁরা নতুন চুক্তিতে ঘণ্টাপ্রতি এক ডলার মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে কাউন্টি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, আর্থিক দায়িত্বশীলতা বজায় রেখেই কর্মীদের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা ভেঙে যাওয়ায় ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হয়েছে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এটিকে ওহাইওর ইতিহাসে দীর্ঘতম সরকারি খাতের ধর্মঘট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম সরকারি খাতের ধর্মঘটের রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলেও বলা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রেকর্ড ভেঙে গেছে এমন দাবি এখনই করা যাচ্ছে না।
মিনেসোটাতেও একই ধরনের অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। সেখানে বিশেষ শিক্ষাসেবা সহকারী হিসেবে কাজ করেন বব ম্যাটিলা। তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা ঘণ্টাপ্রতি ২৫ ডলার মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিমার খরচ কমানোর দাবিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা চাইছেন।
ম্যাটিলার অভিযোগ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেও তাঁরা যথেষ্ট বেতন পাচ্ছেন না। বর্তমান আয়ে পরিবারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি গাড়ির জ্বালানি কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, ঘণ্টাপ্রতি ২৫ ডলারের কম আয় করে প্রতিবার গাড়িতে ৫০ ডলারের জ্বালানি ভরা তাঁর জন্য বড় আর্থিক চাপ।
শ্রমিকদের এই অসন্তোষ নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠনগুলোর ফেডারেশন এএফএল-সিআইওর সভাপতি লিজ শুলার বলেছেন, শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। খাদ্য, জ্বালানি, বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তার সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি তাল মেলাতে পারছে না।
শুলারের নেতৃত্বাধীন সংগঠন এবারের নির্বাচনে শ্রমিক পরিবারের প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সংগঠনটির লক্ষ্য শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর দাবিকে নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া।
মিশিগানের ডেট্রয়েটেও শ্রমিকদের মধ্যে একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। সেখানে গাড়িশিল্পের শ্রমিক সংগঠনের সদস্য ২৭ বছর বয়সী বেইলি পোর্টার বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। তাঁর সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ। তিনি সবার জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
পোর্টারের মতে, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিল বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। আগে যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবার মাসের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে পারত, এখন একই অর্থে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষকে খাবার কেনা থেকে শুরু করে অন্যান্য জরুরি ব্যয় পর্যন্ত হিসাব করে চলতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংকটের প্রকৃত চিত্র বুঝতে যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্যের প্রচলিত সরকারি হিসাবের পাশাপাশি নতুন কিছু গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থনীতিবিদ ও ইউনাইটেড ফর অ্যালিসের পরিচালক ড. স্টেফানি হুপস মনে করেন, সরকারি দারিদ্র্যসীমা দিয়ে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আর্থিক দুরবস্থা পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ, একই আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও এলাকায় এক রকম নয়।
ইউনাইটেড ফর অ্যালিসের ২০২৬ সালের জাতীয় প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মোট পরিবারের ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ আর্থিক সংকটের মধ্যে ছিল। সংখ্যার হিসাবে এটি পাঁচ কোটি ৪৫ লাখের বেশি পরিবার।
এই হিসাবের মধ্যে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার ছিল সরকারি দারিদ্র্যসীমার নিচে। অন্যদিকে ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার সরকারি দারিদ্র্যসীমার ওপরে আয় করলেও নিজেদের এলাকার খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, যাতায়াত ও অন্যান্য মৌলিক ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ উপার্জন করতে পারেনি।
গবেষণায় এই দ্বিতীয় শ্রেণির পরিবারগুলোকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের অনেকেই নিয়মিত কাজ করেন, কিন্তু মাস শেষে সঞ্চয় তো দূরের কথা, দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেই সমস্যায় পড়েন। অর্থাৎ চাকরি থাকলেই যে একটি পরিবার আর্থিকভাবে নিরাপদ, বাস্তব পরিস্থিতি তা বলছে না।
মিসৌরির সেন্ট লুইসের নার্সিং সহকারী শুন্ডা হুইটফিল্ডের অভিজ্ঞতা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করেছে। তিনি লুপাস নামের জটিল রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করতে হয় তাঁকে। কিন্তু ওষুধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন পরিবারের খাবার কেনা এবং নিজের প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
হুইটফিল্ডের বক্তব্য, কখনো কখনো ওষুধ কেনার জন্য তাঁকে পরিবারের খাবারের খরচ কমাতে হয়। আবার কাজে যাওয়ার জন্য যাতায়াতের অর্থও হিসাব করে রাখতে হয়। তাঁর মতো একজন কর্মজীবী মানুষের জন্য চিকিৎসা ও খাবারের মধ্যে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এদিকে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নরসহ স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ পদেও ভোট হবে। ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যগুলোর রাজনৈতিক নেতৃত্বেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
নির্বাচনে কোন দল জয়ী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় যে ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে, তা শ্রমিকদের বক্তব্য এবং সাম্প্রতিক গবেষণায় স্পষ্ট। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রার্থীরা ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
তবে নির্বাচনে যে দলই জয়ী হোক, রাতারাতি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত মজুরি নিশ্চিত করা, চিকিৎসার ব্যয় কমানো এবং সাধারণ পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা কিংবা পরিবর্তনের লড়াই নয়; এটি সাধারণ মানুষের খাবার, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভোটারদের প্রত্যাশা, নতুন জনপ্রতিনিধিরা যেন শুধু ধনীদের স্বার্থ নয়, বরং পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও কার্যকর ভূমিকা রাখেন।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।