নতুন জীবনের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে এসে প্রাণ হারাল ঘানার কিশোর, শোকে ব্রঙ্কস
স্কুলে যাওয়ার পথে গুলিতে নিহত জাভিটস ফ্রিম্পংয়ের স্মৃতিতে ব্রঙ্কসে শোকসভা; বাবার কান্না, মায়ের ভিসা ও বিচার দাবিতে উত্তাল স্থানীয় সম্প্রদায়।
নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে গুলিতে নিহত ১৫ বছর বয়সী ঘানার অভিবাসী কিশোর জাভিটস ফ্রিম্পংয়ের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। সন্তানকে হারানোর বেদনা সহ্য করতে না পেরে শনিবার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলে ফিরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা থমাস ফ্রিম্পং। ছেলের রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত সেই সড়কে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন তিনি। তাঁকে ঘিরে ধরেন স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। একপর্যায়ে শোকে ভেঙে পড়া বাবাকে ধরে সরিয়ে নিয়ে যান উপস্থিত ব্যক্তিরা।
গত ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকালে ব্রঙ্কসের ক্লেয়ারমন্ট এলাকায় ইস্ট ১৭১তম স্ট্রিট ও ক্রোটোনা প্লেসের কাছে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। পুলিশ জানায়, সকাল সাড়ে নয়টার কিছু আগে ১৫ বছর বয়সী জাভিটসের পেটে গুলি লাগে। ঘটনাস্থলে পৌঁছানো পুলিশ সদস্যরা তাঁকে দ্রুত সেন্ট বার্নাবাস হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথেই প্রাণ হারায় এই কিশোর।
জাভিটসের বাবা থমাস ফ্রিম্পং জানান, ২০২৫ সালে ঘানা থেকে ছেলেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। উন্নত শিক্ষা, নিরাপদ জীবন এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় ছেলেকে নিজের কাছে এনেছিলেন। নিউইয়র্কে এসে জাভিটস ড্রিমইয়ার্ড প্রস্তুতিমূলক বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিল। পড়াশোনায় ভালো ছিল সে। স্বভাবেও ছিল শান্ত ও লাজুক। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখত। বাবার ভাষায়, ছেলে ছিল তাঁর সবকিছু।
হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন আগে বিদ্যালয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে জাভিটসের বিরোধের ঘটনা ঘটেছিল বলে জানিয়েছেন তার বাবা। তাঁর অভিযোগ, দুই শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে ছেলেকে বিরক্ত করছিল। বিষয়টি নিয়ে জাভিটস একাধিকবার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগ করেছিল। পরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থমাসকে জানান, দুই শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু বাবা তখনো বুঝতে পারেননি, এই বিরোধ এত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
থমাসের বক্তব্য অনুযায়ী, ছেলে তাকে জানিয়েছিল, দুপুরের খাবার খাওয়ার সময়ও একজন শিক্ষার্থী তাকে বারবার উত্ত্যক্ত করত। সে বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয়ের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিল। কিন্তু এসব ঘটনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ। তদন্তকারীরা হত্যার উদ্দেশ্য এবং সন্দেহভাজনদের সঙ্গে কিশোরটির কোনো বিরোধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।
ঘটনার পর নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ সামনে আসায় এলাকায় আরও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ফুটেজে একজনকে জাভিটসের পেছনে ধাওয়া করতে দেখা গেছে বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে কয়েকজন মুখোশধারী ব্যক্তিকে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে দেখা যায়। পুলিশ তিন কিশোরকে খুঁজছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তাদের বয়স আনুমানিক ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। পরনে কালো পোশাক এবং মুখে নীল অস্ত্রোপচারজনিত মুখোশ ছিল বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিদ্যালয়ে নির্যাতনের অভিযোগের সঙ্গে এই হত্যার যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তাধীন। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
শনিবার ঘটনাস্থলে জড়ো হন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, প্রতিবেশী এবং ঘানার অভিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্যরা। তাঁরা নিহত কিশোরের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। ব্রঙ্কসের জেলা অ্যাটর্নি ডার্সেল ক্লার্ক সন্দেহভাজনদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অপরাধীদের খুঁজে বের করতে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। কেউ তাদের আশ্রয় দিয়ে থাকলে কিংবা তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানলে কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নিউইয়র্ক নগরের জনঅধিকারবিষয়ক প্রতিনিধি জুমানে উইলিয়ামস এই হত্যাকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অস্ত্র সহিংসতার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একজন বাবা কঠোর পরিশ্রম করে ছেলেকে যুক্তরাষ্ট্রে এনেছিলেন একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায়। অথচ সেই স্বপ্ন পূরণের পরিবর্তে পরিবারটিকে এখন সন্তানের লাশের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাই এই কিশোরকে ব্যর্থ করেছে। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য বর্ণের মানুষের ওপর সহিংসতার প্রভাব এবং আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
ব্রঙ্কসের বরো প্রেসিডেন্ট ভ্যানেসা গিবসন বলেন, এই হত্যাকাণ্ড পুরো এলাকা, নগর ও অঙ্গরাজ্যকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। একটি পরিবার তার সন্তানকে হারিয়েছে, আর সেই শোককে নিজেদের শোক হিসেবে দেখছে স্থানীয় সম্প্রদায়। কংগ্রেস সদস্য রিচি টরেসও নিহত কিশোরের মায়ের যুক্তরাষ্ট্রে আসার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।
এদিকে ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই ঘানায় থাকা জাভিটসের মা শোকে ভেঙে পড়েছেন। সন্তানের শেষকৃত্যে অংশ নিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসতে চান। কিন্তু ভিসা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে মামদানি জানান, ট্রাম্প জাভিটসের মাকে দ্রুত ভিসা দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন, যাতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এসে ছেলেকে শেষবারের মতো দেখতে পারেন। তবে ওই ঘোষণার সময় ভিসা আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘানার পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যামুয়েল ওকুদজেতো আবলাকওয়া নিহত কিশোরের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে হত্যার বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। ঘানার কর্মকর্তারা নিউইয়র্কের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলেও জানানো হয়েছে।
জাভিটসের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শেষকৃত্য ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে অনুদান সংগ্রহ করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে শনিবার পর্যন্ত সাত লাখ পনেরো হাজার ডলারের বেশি অনুদান জমা পড়ার কথা জানানো হয়। তবে পরিবারের কাছে অর্থের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্তানের হত্যার সঠিক কারণ জানা এবং দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা।
পুলিশের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য থাকলে অপরাধ দমন বিভাগে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়েছে। তথ্যদাতারা ১-৮০০-৫৭৭-৮৪৭৭ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন। তাঁদের পরিচয় গোপন রাখার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এক বছর আগে ঘানা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা জাভিটসের স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে চিকিৎসক হওয়া। বাবার সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করেছিল সে। কিন্তু বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে একটি গুলিই শেষ করে দিল তার সব স্বপ্ন। এখন ব্রঙ্কসের সেই সড়কে দাঁড়িয়ে বাবার কান্না, মায়ের দূরদেশের অপেক্ষা এবং পরিবারের বিচার পাওয়ার আকুতি একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, বিদ্যালয় ও প্রশাসন কি যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে? জাভিটসের পরিবার চায়, তার হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হোক, অপরাধীরা গ্রেপ্তার হোক এবং আর কোনো পরিবারকে এমন নির্মম শোকের মুখোমুখি হতে না হয়।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।