নিউইয়র্ক ম্যারাথনে প্রায় ৬০ হাজার দৌড়বিদ, পাঁচ বরোর পথে উৎসবের ঢেউ
নিউইয়র্কের পাঁচ বরো পেরিয়ে অনুষ্ঠিত ম্যারাথনে প্রায় ৬০ হাজার দৌড়বিদের অংশগ্রহণ, লাখো দর্শকের উচ্ছ্বাস আর দাতব্য অর্থ সংগ্রহে নতুন ইতিহাস।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দৌড় প্রতিযোগিতা নিউইয়র্ক ম্যারাথন। রবিবার, ১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় প্রায় ৬০ হাজার দৌড়বিদ অংশ নেন। নগরের পাঁচটি বরো পেরিয়ে ২৬ দশমিক ২ মাইল বা ৪২ দশমিক ১৯৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন প্রতিযোগীরা। পথজুড়ে দর্শকদের উচ্ছ্বাস, স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তা এবং দৌড়বিদদের দৃঢ় প্রত্যয়ে নগরজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং আয়োজক সংস্থা নিউইয়র্ক রোড রানার্সের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল প্রায় ৬০ হাজার দৌড়বিদের। প্রতিযোগিতাটি ছিল পাঁচ বরো নিয়ে গঠিত বর্তমান পথের পঞ্চাশতম বার্ষিকী উদ্যাপনের অংশ। ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার দুইশত বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রথমবারের মতো নগরের পাঁচটি বরো ঘুরে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এবারের প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পেশাদার ও শৌখিন দৌড়বিদেরা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অভিজ্ঞ ম্যারাথন দৌড়বিদ, প্রথমবারের প্রতিযোগী, প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ এবং বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের হয়ে অর্থ সংগ্রহে নামা অংশগ্রহণকারীরা। প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত সমাপ্তির সংখ্যা প্রকাশের কথা ছিল ২ নভেম্বর। ফলে প্রায় ৬০ হাজার অংশগ্রহণের তথ্যকে আয়োজকদের ঘোষিত আনুমানিক সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রতিযোগিতার শুরু হয় স্টেটেন আইল্যান্ডের ফোর্ট ওয়াডসওয়ার্থ এলাকা থেকে। দৌড়বিদেরা ভেরাজানো-ন্যারোজ সেতু পেরিয়ে ব্রুকলিনে প্রবেশ করেন। এরপর কুইন্স, ম্যানহাটন ও ব্রঙ্কস ঘুরে আবার ম্যানহাটনে ফিরে সেন্ট্রাল পার্কে শেষ করেন দৌড়। এই পথের বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; বরং নিউইয়র্কের বৈচিত্র্যময় জনপদ, সংস্কৃতি ও নগরজীবনের এক সম্মিলিত প্রদর্শনী।
দৌড়ের পথে দুই মিলিয়নেরও বেশি দর্শক উপস্থিত থাকার প্রত্যাশা জানিয়েছিল নগর কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন পাড়া ও সড়কে দর্শকেরা হাততালি, সংগীত ও উৎসাহের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করেন। বহু স্বেচ্ছাসেবী পানি সরবরাহ, পথনির্দেশনা এবং অন্যান্য সহায়তামূলক কাজে অংশ নেন। নগরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এই প্রতিযোগিতাকে নিজেদের উৎসব হিসেবে গ্রহণ করেন।
এবারের পুরুষদের মূল বিভাগে সুইডেনের আন্দ্রেয়াস আলমগ্রেন প্রথম স্থান অর্জন করেন। এটি ছিল তাঁর প্রথম পূর্ণ ম্যারাথন প্রতিযোগিতা। আয়োজকদের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, তিনি শেষ পর্যায়ে এগিয়ে গিয়ে জয় নিশ্চিত করেন। নিউইয়র্ক ম্যারাথনের ইতিহাসে প্রথমবার অংশ নিয়েই পুরুষদের মূল বিভাগে জয় পাওয়া বিরল ঘটনা। আলমগ্রেনের এই জয় সুইডেনের জন্যও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
নারীদের মূল বিভাগে কেনিয়ার শেইলা চেপকিরুই দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয় করেন। তিনি ২ ঘণ্টা ২৪ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড সময়ে দৌড় শেষ করেন। প্রতিযোগিতার শেষ পর্যায়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নিয়ে তীব্র লড়াই হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জেস ম্যাকক্লেইন দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন, আর গত বছরের বিজয়ী হেলেন ওবিরি তৃতীয় হন।
হুইলচেয়ার বিভাগেও ছিল উল্লেখযোগ্য সাফল্য। পুরুষদের বিভাগে সুইজারল্যান্ডের মার্সেল হুগ ১ ঘণ্টা ২৮ মিনিট ১৪ সেকেন্ড সময়ে জয় পান। এটি ছিল নিউইয়র্ক ম্যারাথনে তাঁর অষ্টম শিরোপা। নারীদের হুইলচেয়ার বিভাগে সুইজারল্যান্ডের ক্যাথরিন ডেব্রুনার ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট ২ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে বিজয়ী হন। তাঁর জয় ছিল বড় ব্যবধানের, যা প্রতিযোগিতার অন্যতম আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে।
এবারের ম্যারাথনের আরেকটি বড় দিক ছিল দাতব্য অর্থ সংগ্রহ। আয়োজকদের লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহ করা। প্রতিযোগিতার আগে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ লক্ষ্য অতিক্রম করা হয়। দৌড়বিদেরা ক্যানসার গবেষণা, ক্ষুধা মোকাবিলা, স্মৃতিভ্রংশ রোগ নিয়ে সচেতনতা এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। ফলে প্রতিযোগিতাটি ক্রীড়ার পাশাপাশি মানবিক সহায়তারও বড় মাধ্যম হয়ে ওঠে।
নিউইয়র্ক ম্যারাথনের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭০ সালে। সে বছর প্রতিযোগিতাটি সেন্ট্রাল পার্কের ভেতরে কয়েক দফা ঘুরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নিবন্ধিত দৌড়বিদ ছিলেন অল্পসংখ্যক, আর শেষ পর্যন্ত ৫৫ জন দৌড় শেষ করেন। ১৯৭৬ সালে পাঁচ বরো জুড়ে নতুন পথ চালু হওয়ার পর প্রতিযোগিতাটি আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেতে শুরু করে। বর্তমানে এটি বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে পরিচিত নগরভিত্তিক ম্যারাথনগুলোর একটি।
এবারের প্রতিযোগিতা ঘিরে নগর কর্তৃপক্ষ দর্শকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে। শেষ ২০০ মিটার পথের দর্শক আসনে নিউইয়র্কবাসীদের জন্য বিনা মূল্যে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। প্রতিযোগিতার পথের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল সীমিত করা হয়, যাতে দৌড়বিদেরা নিরাপদে পথ অতিক্রম করতে পারেন।
প্রায় ৬০ হাজার দৌড়বিদের অংশগ্রহণ, পাঁচ বরোর জনসমাগম, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের সাফল্য এবং দাতব্য অর্থ সংগ্রহ—সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের নিউইয়র্ক ম্যারাথন নগরের ক্রীড়া ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। তবে অংশগ্রহণের আনুষ্ঠানিক চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশের পরই মোট দৌড় শেষ করা ব্যক্তির সংখ্যা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।