ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কের বিরুদ্ধে সিনেটে ৫১-৪৭ ভোটে বড় ধাক্কা
ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে বিরল সমর্থন পেয়েছে বিরোধীরা। তবে আইন কার্যকর হওয়া নিয়ে এখনো রয়েছে বড় অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতির বিরুদ্ধে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা দিয়েছেন দেশটির সিনেটররা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যের ওপর আরোপ করা শুল্কের আইনি ভিত্তি বাতিলের পক্ষে ৫১-৪৭ ভোট দিয়েছেন সিনেট সদস্যরা। ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই ভোটকে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই ভোটে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি চারজন রিপাবলিকান সিনেটরও ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরোধিতা করেন। তাঁরা হলেন মিচ ম্যাককনেল, র্যান্ড পল, সুসান কলিন্স ও লিসা মারকোস্কি। তাঁদের সমর্থনের কারণে প্রস্তাবটি প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সিনেটে পাস হয়।
তবে সিনেটের এই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে, সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বৈশ্বিক শুল্ক প্রত্যাহার হয়ে গেছে। কারণ, প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হতে হলে প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদন এবং পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। ফলে ভোটটি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর হলেও এর তাৎক্ষণিক বাস্তব প্রভাব সীমিত ছিল।
ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতিকে জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর নতুন আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়। দিনটিকে তিনি মুক্তি দিবস হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রায় সব দেশের পণ্যের ওপর ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য পরিস্থিতি বিবেচনায় অতিরিক্ত শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর ফলে অনেক দেশের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে অসম পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ পণ্য বিক্রি করলেও মার্কিন পণ্যের জন্য সমান সুযোগ দেয় না। এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে শুল্ক আরোপ প্রয়োজন বলে মনে করে প্রশাসন।
অন্যদিকে শুল্কনীতির সমালোচকদের বক্তব্য, আমদানি করা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের খরচ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর গিয়ে পড়ে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান শুল্ক সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে দেয় না—বরং যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে সীমান্তে এই অর্থ পরিশোধ করতে হয়। পরে সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এতে পোশাক, ইলেকট্রনিকস, গৃহস্থালি সামগ্রী, যন্ত্রাংশ, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানি করে, তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সিনেটের এই প্রস্তাবের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর রন ওয়াইডেন। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শুল্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা কংগ্রেসের রয়েছে। জাতীয় জরুরি অবস্থার ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রেসিডেন্টের এককভাবে এত বিস্তৃত শুল্কনীতি বাস্তবায়ন করা উচিত নয়।
প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেওয়া রিপাবলিকান সিনেটরদের অবস্থানও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ট্রাম্প নিজ দলের প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্য অবস্থান নিয়েছেন। এটি রিপাবলিকান দলের ভেতরে শুল্কনীতি নিয়ে মতপার্থক্যের ইঙ্গিত দেয়।
সিনেটের সরকারি ভোটের নথি অনুযায়ী, প্রস্তাবটির পক্ষে ৫১ জন এবং বিপক্ষে ৪৭ জন ভোট দেন। দুজন সিনেটর ভোটে অংশ নেননি। সাধারণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় ৬০ ভোটের প্রয়োজন হলেও এই প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট ছিল। <Cite refs={[“turn405970search2”,“turn405970search7”]}/>
এই প্রস্তাবের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় রয়েছে। ট্রাম্প তাঁর বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের জন্য ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন ব্যবহার করেছিলেন। এই আইনের মাধ্যমে জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্টকে কিছু বিশেষ অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এই ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে শুল্ক আরোপ করা যায় কি না, তা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল।
সিনেটরদের যুক্তি ছিল, এই আইনকে ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর এত বড় প্রভাব ফেলতে পারেন না। তাই জাতীয় জরুরি অবস্থার ঘোষণা বাতিলের মাধ্যমে শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তি বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে প্রতিনিধি পরিষদে এই প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। সেখানে রিপাবলিকান নেতৃত্ব ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে প্রস্তাবগুলো দ্রুত ভোটে আনার বিষয়ে বাধা তৈরি করেছিল। ফলে সিনেটে পাস হওয়ার পরও প্রস্তাবটি আইন হিসেবে কার্যকর হওয়ার পথ সহজ ছিল না।
প্রতিনিধি পরিষদে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়া গেলেও প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর ছাড়া যৌথ প্রস্তাবটি আইনে পরিণত হওয়ার কথা নয়। ট্রাম্প নিজেই তাঁর শুল্কনীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এমন প্রস্তাবে তাঁর স্বাক্ষর পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হতো সেই ভেটো অতিক্রম করতে।
এদিকে শুল্কনীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি ব্যবসায়িক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন শুল্কের কারণে পণ্যের দাম, সরবরাহব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পোশাক ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম বড় ভোক্তা বাজার। সেখানে আমদানি শুল্ক বাড়লে বিদেশি রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান এবং ক্রেতাদের পণ্য কেনার সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে শুল্কের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য নির্ধারিত হার, পণ্যের ধরন, বাণিজ্যচুক্তি এবং পরবর্তী নীতিগত পরিবর্তনের ওপর। তাই সিনেটের ভোটের কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে বা শুল্ক কমে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।