জর্জিয়ায় ১৩০ কোটি ডলারে ওয়ালমার্টের বিশাল কেন্দ্র, তৈরি হবে ১ হাজার চাকরি
৮,৬৫৬ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে বড় ধরনের বিনিয়োগের ঘোষণা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট। অঙ্গরাজ্যের উত্তরাঞ্চলের ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টির কার্নসভিল শহরে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার ব্যয়ে একটি বিশাল আধুনিক পণ্য সরবরাহকেন্দ্র নির্মাণ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আসার পাশাপাশি প্রায় এক হাজার মানুষের পূর্ণকালীন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত ২৬ অক্টোবর সোমবার প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় ১৫ লাখ বর্গফুট জায়গাজুড়ে নির্মিত হতে যাওয়া এই কেন্দ্রটি ওয়ালমার্টের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ষষ্ঠ পণ্য সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এখানে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি, যন্ত্রের মাধ্যমে শেখার পদ্ধতি এবং দক্ষ কর্মীদের সমন্বয়ে অনলাইন কেনাকাটার পণ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ব্রায়ান কেম্প গত ২৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি জানান, ওয়ালমার্টের এই প্রকল্পে ফ্র্যাঙ্কলিন কাউন্টিতে ১৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগ হবে এবং প্রায় এক হাজার নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। অঙ্গরাজ্যের গ্রামীণ অঞ্চলে এত বড় বিনিয়োগ স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডব্লিউএসবি টিভির ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কার্নসভিলের ১০৭২৫ ওল্ড ফেডারেল রোডে নির্মাণাধীন কেন্দ্রটির অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি ফ্র্যাঙ্কলিন ৮৫ লজিস্টিকস সেন্টার এলাকার মধ্যে গড়ে উঠছে। বিশাল এই স্থাপনায় পণ্য সংরক্ষণ, বাছাই, মোড়কজাত করা এবং ক্রেতাদের কাছে পাঠানোর জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। নতুন কেন্দ্রটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর স্বয়ংক্রিয় পণ্য সংরক্ষণ ও সংগ্রহব্যবস্থা। প্রচলিত পণ্য সরবরাহকেন্দ্রে একটি অনলাইন অর্ডার সম্পন্ন করতে সাধারণত ১২টি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু ওয়ালমার্টের নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া কমিয়ে মাত্র পাঁচটি ধাপে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। ফলে কর্মীদের সময় ও শ্রম কম লাগবে এবং একই সময়ে অনেক বেশি অর্ডার সম্পন্ন করা যাবে। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রতিদিন গ্রাহকদের অর্ডার প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা দ্বিগুণ হতে পারে। একই সঙ্গে প্রচলিত পণ্য সরবরাহকেন্দ্রের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পণ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ, কম সময়ে বেশি পণ্য সংগ্রহ করে ক্রেতাদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা তৈরি হবে। এই ব্যবস্থায় পণ্য সরবরাহের বিভিন্ন ধাপ একে অপরের সঙ্গে প্রযুক্তির মাধ্যমে যুক্ত থাকবে। প্রথমে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য কেন্দ্রে আসবে। এরপর সেগুলো নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র পণ্যগুলোকে নির্ধারিত সংরক্ষণস্থলে পৌঁছে দেবে। অনলাইনে কোনো ক্রেতা অর্ডার দিলে সেই অর্ডার অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করে মোড়কজাত করার জন্য কর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এরপর প্যাকেট প্রস্তুত করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। ওয়ালমার্টের আগের আধুনিক সরবরাহকেন্দ্রগুলোতেও এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে তাদের নতুন প্রজন্মের সরবরাহকেন্দ্রের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। সেখানে মানুষের শ্রম, রোবট এবং যন্ত্রের মাধ্যমে শেখার প্রযুক্তির সমন্বয়ে পণ্য সরবরাহের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছিল। নতুন জর্জিয়া কেন্দ্রটি সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ। এই বিনিয়োগের আরেকটি বড় দিক হলো কর্মসংস্থান। ওয়ালমার্ট জানিয়েছে, কেন্দ্রটির কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হলে স্থানীয়ভাবে প্রায় এক হাজার পূর্ণকালীন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে সাধারণ গুদাম পরিচালনা, পণ্য ব্যবস্থাপনা, মোড়কজাতকরণ, যন্ত্র পরিচালনা, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য কারিগরি কাজের সুযোগ থাকবে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর কিছু পদে দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে শুধু সাধারণ শ্রমিক নয়, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিদের জন্যও চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনায় কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত উন্নতির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
তবে চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য কয়েকটি বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়। এক হাজার পদে নিয়োগের আবেদন কবে থেকে শুরু হবে, কোন পদে কতজন কর্মী নেওয়া হবে এবং নতুন কর্মীদের প্রারম্ভিক বেতন কত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ঘোষণা আসেনি। তাই এখনই নির্দিষ্ট বেতন বা নিয়োগের শেষ সময়সীমা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়। কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি ও সম্প্রসারণের সঙ্গে নিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের অর্থনীতিতে ওয়ালমার্টের উপস্থিতি আগে থেকেই উল্লেখযোগ্য। গভর্নরের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অঙ্গরাজ্যটিতে প্রতিষ্ঠানটির ২০৯টি ওয়ালমার্ট ও স্যামস ক্লাব বিক্রয়কেন্দ্র এবং ১১টি পণ্য সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা স্থাপনা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ৬৫ হাজার ৩০০-এর বেশি কর্মী কাজ করেন। এ ছাড়া ২০২৫ অর্থবছরে জর্জিয়ার বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ওয়ালমার্ট ২৬২০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য ও সেবা সংগ্রহ করেছে। এর মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক লাখ ৬৭ হাজার ৬০০-এর বেশি কর্মসংস্থানকে সহায়তা করা হয়েছে বলে গভর্নরের কার্যালয় জানিয়েছে। নতুন কেন্দ্রটি চালু হলে এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কার্নসভিলের মতো তুলনামূলক ছোট শহরে এত বড় বিনিয়োগের প্রভাব শুধু সরাসরি চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নতুন স্থাপনা নির্মাণের জন্য নির্মাণশ্রমিক, প্রকৌশলী, যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর পরিবহন, খাবার সরবরাহ, আবাসন, গাড়ি মেরামত এবং অন্যান্য স্থানীয় ব্যবসার চাহিদাও বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, বড় পণ্য সরবরাহকেন্দ্র কোনো এলাকায় স্থাপিত হলে সেখানে পরিবহন ও পণ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজন বাড়ে। একই সঙ্গে নতুন কর্মীদের যাতায়াত, আবাসন এবং দৈনন্দিন সেবার চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। ফলে সরাসরি নিয়োগের বাইরেও পরোক্ষভাবে স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উপকৃত হতে পারে। ওয়ালমার্টের এই প্রকল্পের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন কেনাকাটার বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ক্রেতারা ঘরে বসে পণ্য কেনার পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে পণ্য হাতে পাওয়ার প্রত্যাশা করেন। বিশেষ করে একই দিনে অথবা পরের দিনে পণ্য সরবরাহ করতে পারা বড় খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হয়ে উঠেছে। ওয়ালমার্টের হাজার হাজার বিক্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি অনলাইন ব্যবসাও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন সরবরাহকেন্দ্রটি সেই ব্যবসাকে আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছে। এখানে বেশি পণ্য মজুত রাখা গেলে অনলাইন ক্রেতাদের অর্ডার অনুযায়ী দ্রুত পণ্য সংগ্রহ করা সহজ হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সময়ও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে জর্জিয়া এবং আশপাশের অঞ্চলে অনলাইন অর্ডার সরবরাহের সক্ষমতা বাড়াতে কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সব এলাকায় একই দিনে বা পরের দিনে পণ্য পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত হবে—এমন কোনো ঘোষণা এখনো দেওয়া হয়নি। এটি নির্ভর করবে পণ্যের অবস্থান, অর্ডারের ধরন, পরিবহনব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সরবরাহসুবিধার ওপর। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও কর্মীদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে মানুষের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সমন্বয় করার কথা বলছে প্রতিষ্ঠানটি। আধুনিক যন্ত্রপাতি পণ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অনেক কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে পারবে। অন্যদিকে কর্মীরা পণ্য যাচাই, যন্ত্র পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন।
নতুন কেন্দ্রটির নির্মাণ শেষ হওয়ার পর ধাপে ধাপে কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে এক হাজার কর্মীর নিয়োগ কোন সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে, সে বিষয়েও আনুষ্ঠানিক সময়সূচি পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।