অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
৪৪৬ মিলিয়ন ডলারের চমক! মার্কিন নির্বাচনে ইতিহাসের সর্বোচ্চ অর্থ ঢাললেন ইলন মাস্ক
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান শিবিরে ইলন মাস্কের ৪৪৬ মিলিয়ন ডলারের অনুদান মার্কিন রাজনীতিতে ধনকুবেরদের প্রভাব ও নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রায় ৪৪৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে দেশটির আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত নির্বাচনী অর্থদাতার রেকর্ড গড়েছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। তাঁর বিপুল অর্থায়নের বড় অংশই গেছে রিপাবলিকান দলঘনিষ্ঠ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, নির্বাচনী প্রচার তহবিল এবং বিশেষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী সংগঠনের কাছে। নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একজন ধনকুবেরের এত বিপুল অর্থ ব্যয় মার্কিন রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব, গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
৩০ অক্টোবর প্রকাশিত মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাস্কের দেওয়া অর্থের পরিমাণ ৪৪৫ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের নির্বাচনী অর্থায়নবিষয়ক বিশ্লেষণে তাঁর মোট অবদানের পরিমাণ ৪৪৬ মিলিয়ন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অর্থায়নের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নির্বাচনী অর্থায়নসংক্রান্ত নথির ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে।
এই অর্থের পরিমাণ শুধু একজন ধনকুবেরের রাজনৈতিক আগ্রহের পরিচয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে ব্যক্তিগত সম্পদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবেরও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এর মাধ্যমে মাস্ক দেশটির আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকাশিত ব্যক্তিগত নির্বাচনী অর্থদাতা হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন।
মাস্কের অর্থায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ পেয়েছে তাঁর সমর্থিত বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠন আমেরিকা প্যাক। প্রকাশিত নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী, এই সংগঠনে তাঁর অবদানের পরিমাণ প্রায় ২১৬ মিলিয়ন ডলার। সংগঠনটি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নির্বাচনী লড়াইয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার, ভোটারদের কাছে পৌঁছানো এবং নির্বাচনী উপস্থিতি বাড়ানোর কাজে যুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া রিপাবলিকানদের সিনেট নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন সিনেট লিডারশিপ ফান্ডে মাস্ক প্রায় ১৬৮ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনকারী কংগ্রেশনাল লিডারশিপ ফান্ডেও তাঁর ৩০ মিলিয়ন ডলারের অবদানের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এসব অর্থায়ন দেখায়, শুধু একটি সংগঠন নয়, বরং রিপাবলিকানদের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনী প্রচারে তাঁর অর্থের বিস্তৃত ব্যবহার রয়েছে।
বিশেষ করে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচন মাস্কের রাজনৈতিক অর্থায়নের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটন এবং ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই নির্বাচনের ফলাফল সিনেটে কোন দলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টেক্সাসের নির্বাচনী প্রচারে বিভিন্ন রিপাবলিকানপন্থী সংগঠনের মাধ্যমে মাস্কের অর্থায়নের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। তাঁর নিজের রাজনৈতিক সংগঠন ছাড়াও অন্য সংগঠনের কাছে দেওয়া অর্থ পরবর্তী সময়ে টালারিকোর বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে ব্যবহৃত হয়েছে। বিভিন্ন প্রচারপত্র, ডাকযোগে পাঠানো বার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন এবং টেলিভিশন প্রচারের মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
মাস্কের এই অর্থ ব্যয়ের পেছনে রাজনৈতিক হিসাবের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তিনি বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা এবং মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। মহাকাশ গবেষণা, প্রতিরক্ষা, উপগ্রহ যোগাযোগ এবং সরকারি প্রযুক্তি প্রকল্পে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশের অভিযোগ, নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে মাস্ক এমন রাজনৈতিক শক্তিকে সহযোগিতা করছেন, যাদের ক্ষমতায় থাকা তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে তাঁর সরকারি দায়িত্ব, সরকারি চুক্তি এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের দাবি আরও জোরালো হতে পারে।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে সরকারি ব্যয় কমানোর উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন মাস্ক। সরকারি দক্ষতা বৃদ্ধির নামে পরিচালিত সেই উদ্যোগের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি বিভাগে কর্মীসংখ্যা ও ব্যয় কমানোর চেষ্টা হয়েছিল। তবে ওই ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক, সরকারি কর্মসূচিতে প্রভাব এবং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৬ সালের নির্বাচনী অর্থায়নে মাস্কের এই বিপুল অর্থ ব্যয় তাঁর আগের অবস্থান থেকেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধের পর একসময় তিনি রাজনৈতিক অর্থায়ন কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি নির্বাচনী চক্রে আবারও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে রিপাবলিকানদের অন্যতম প্রধান অর্থদাতায় পরিণত হয়েছেন।
অন্যদিকে, শুধু মাস্ক নন, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রচারেই বিপুল অর্থ প্রবাহিত হচ্ছে। ওয়াশিংটন পোস্টের ২৩ অক্টোবরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্বাচনী চক্রে সবচেয়ে বড় ৫০ জন অর্থদাতা ও সংগঠনের মোট অবদান ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর মধ্যে রিপাবলিকানপন্থী অর্থদাতাদের অবদান প্রায় ১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। ডেমোক্র্যাটপন্থী অর্থদাতাদের অবদান প্রায় ৮৩২ মিলিয়ন ডলার। বাকি অর্থ বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও দুই দলের সঙ্গে সম্পর্কিত সংগঠন দিয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের বড় অর্থদাতাদের মধ্যে জর্জ সরোস, মাইক ব্লুমবার্গ এবং রিড হফম্যানের নাম রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত অর্থায়নের পরিমাণের দিক থেকে মাস্ক তাঁদের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অর্থের এমন অসম বণ্টন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।
বিশেষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী সংগঠনগুলোর ভূমিকা বোঝা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে এ ধরনের সংগঠন নির্দিষ্ট শর্ত মেনে প্রার্থীদের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারের জন্য বিপুল অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয় করতে পারে। তবে তারা সরাসরি কোনো প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচার কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে অর্থ ব্যয় করতে পারে না। ফলে একজন ধনী ব্যক্তি সরাসরি প্রার্থীকে সীমিত অর্থ দিতে পারলেও এসব সংগঠনের মাধ্যমে অনেক বড় অঙ্কের অর্থ রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করতে পারেন।
এই ব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। সমালোচকদের মতে, বিপুল সম্পদের মালিক ব্যক্তিরা নির্বাচনী প্রচারে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এতে সাধারণ ভোটারদের মতামত ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে, সমর্থকদের যুক্তি, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও নির্বাচনী প্রচারে অর্থ ব্যয় করা নাগরিকদের অধিকার।
ব্রেনান সেন্টারের ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত গবেষণাতেও নির্বাচনী অর্থায়নে ধনকুবেরদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি নির্বাচনী চক্রে সবচেয়ে বড় ৪০ জন অর্থদাতা অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। একই সঙ্গে অর্থের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং বিভিন্ন শিল্প খাতের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের একাংশের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে ভোট গ্রহণ হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং কংগ্রেসে তাঁর দলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মাস্কের বিপুল অর্থায়ন শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের নির্বাচনী জয় নিশ্চিত করবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। নির্বাচনের ফল নির্ভর করবে ভোটারদের মনোভাব, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, জ্বালানি পরিস্থিতি, প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ইস্যুর ওপর।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব নিয়ে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। একজন ব্যক্তির প্রায় ৪৪৬ মিলিয়ন ডলারের নির্বাচনী অবদান যেমন রিপাবলিকানদের প্রচারে বড় শক্তি যোগাচ্ছে, তেমনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব কতটা সমানভাবে নিশ্চিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নও আরও জোরালো করছে।

ইরান যুদ্ধের ব্যয় ৪৭.১ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল, বাড়ছে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ

মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্পের সমাবেশ, ভোট চাইলেন রিপাবলিকানদের পক্ষে

যুক্তরাষ্ট্রের এক শহরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি, নতুন তথ্য জানাবেন কর্মকর্তা জানিস উইনফ্রে







মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।