নভেম্বর মাসেও বাড়ছে না জ্বালানি তেলের দাম, আগের মূল্যেই বিক্রি চলবে দেশজুড়ে
নভেম্বর মাসেও ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার; লিটারপ্রতি আগের দরেই জ্বালানি বিক্রি হবে দেশজুড়ে।
দেশে নভেম্বর মাসেও জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে আগামী ১ নভেম্বর থেকে পুরো মাসজুড়ে আগের নির্ধারিত দামেই ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিন বিক্রি হবে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এ সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে না। একই সঙ্গে দাম কমানোর ঘোষণাও আসেনি।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হবে। নভেম্বর মাসের পুরো সময়জুড়েই দেশের সব পর্যায়ের বিক্রয়কেন্দ্রে এসব দাম কার্যকর থাকার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪সহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই তথ্য উঠে এসেছে। অর্থাৎ নভেম্বর মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার বিষয়টি একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিশ্চিত হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগে নির্ধারিত মূল্যই নভেম্বর মাসে বহাল থাকবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের পক্ষ থেকে ২৬ অক্টোবর এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সরকারের অনুমোদনক্রমে নতুন মাসের জন্য আগের দাম বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াকে ওই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর থেকেই ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের বর্তমান মূল্য চালু রয়েছে।
সেপ্টেম্বরের মূল্যবৃদ্ধির আগে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। অকটেন বিক্রি হতো ১৪৫ টাকায়, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকায়। নতুন সিদ্ধান্তে এসব জ্বালানির দাম ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়। এরপর অক্টোবর মাসেও দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। এবার নভেম্বর মাসেও একই সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় টানা দ্বিতীয় মাসের মতো গ্রাহকদের নির্ধারিত এই দামেই জ্বালানি কিনতে হবে।
জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব খাতের বড় একটি অংশ ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে ডিজেলের দাম স্থিতিশীল থাকলে বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যান, কৃষিযন্ত্র এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জ্বালানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হবে না।
তবে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত থাকলেই পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি পণ্যের মূল্য নির্ধারণে শ্রমিকের মজুরি, যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ, আমদানি ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজার পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে। ফলে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে বাজার ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন খাতের ওপর নজরদারিও প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন দেশের জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ ও সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি সংগ্রহ করতে প্রতিষ্ঠানটিকে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর, জাহাজভাড়া, বিমা, পরিবহন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার—সবকিছুই দেশের জ্বালানি সরবরাহের ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জ্বালানি বিক্রিতে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকার লোকসানের তথ্য উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই লোকসানের হিসাবকে নভেম্বরের মূল্য অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের সরাসরি কারণ হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না। সরকারের প্রকাশিত সিদ্ধান্তে মূলত বিদ্যমান মূল্য বহাল রাখার বিষয়টিই নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু রয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ-সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, আমদানি ব্যয় ও সংশ্লিষ্ট খরচ বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা।
তবে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি থাকলেও প্রতিটি মাসে দাম বাড়বে বা কমবে, এমন নয়। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং সরকারের অনুমোদিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দাম অপরিবর্তিতও রাখা যেতে পারে। নভেম্বর মাসে চার ধরনের জ্বালানির মূল্য বহাল রাখার সিদ্ধান্ত তারই উদাহরণ।
সাধারণ ভোক্তাদের পাশাপাশি কৃষক, পরিবহনশ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কৃষিকাজে সেচযন্ত্র, ফসল পরিবহন এবং পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ডিজেলের ব্যবহার ব্যাপক। ফলে ডিজেলের দাম স্থিতিশীল থাকলে এসব খাতে নতুন করে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা আপাতত কম থাকবে।
অন্যদিকে অকটেন ও পেট্রোলের দাম অপরিবর্তিত থাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরাও নভেম্বর মাসে বাড়তি মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়ছেন না। কেরোসিনের দাম স্থিতিশীল থাকায় এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর ব্যয়েও নতুন কোনো পরিবর্তন আসছে না।
নভেম্বর মাসে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তে দেশের ভোক্তারা নতুন মূল্যবৃদ্ধি থেকে আপাতত স্বস্তি পাচ্ছেন। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ওঠানামা, আমদানি ব্যয় এবং দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর আগামী মাসগুলোর মূল্য নির্ধারণ অনেকটাই নির্ভর করবে। ডিসেম্বর মাসে দাম অপরিবর্তিত থাকবে, বাড়বে নাকি কমবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সরকারি ঘোষণা আসেনি।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।