হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ঘিরে আলোচিত সাবেক কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু, তুরাগে মিলল মরদেহ
হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ঘিরে আলোচনায় আসা সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সৌরীর মরদেহ উদ্ধারের পর মৃত্যুরহস্য তদন্তে নতুন করে তৎপর হয়েছে পুলিশ।
রাজধানীর তুরাগ নদী থেকে সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সৌরীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে। এরই মধ্যে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ তাঁর এক পরিচিতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে। অন্যদিকে পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যার অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি। ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় রয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ বছর বয়সী তাহসিফ সৌরী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক উড্ডয়ন কর্মকর্তা ছিলেন। বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার তুরাগ নদীর টঙ্গীর রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার পর জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা সেখানে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, তাহসিফের পরিচয় নিশ্চিত করতে তাঁর সঙ্গে থাকা মুঠোফোন ও হাতঘড়ি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদ্ধারের সময় তাঁর পরনে ছিল কালো পোশাক ও সাদা পায়জামা। পরে মরদেহটি ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। সেখানে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে পরিবারের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ছেলের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন না। তাঁর সন্দেহ, তাহসিফকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি ছেলের ব্যক্তিত্ব ও সাম্প্রতিক আচরণের কথা উল্লেখ করে আত্মহত্যার সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন। তবে পরিবারের এই অভিযোগের পক্ষে এখনো চূড়ান্ত কোনো প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক পরিচিত তরুণের ডাকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এর আগে তিনি মায়ের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের জন্য কেনাকাটা করেছিলেন। পরে ওই পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে মোটরসাইকেলে বের হন। তাঁদের মধ্যে কিছু সময় একসঙ্গে কাটানোর পর আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা জানা গেছে।
তাহসিফের বাবা জানান, বুধবার রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে ছেলের মুঠোফোন থেকে মায়ের কাছে একটি বার্তা আসে। তাতে লেখা ছিল, ‘আম্মু, আমি আসছি।’ কিন্তু এরপর আর তিনি বাড়িতে ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর সন্ধান পাননি। পরদিন পুলিশ তাঁদের কাছে মরদেহ উদ্ধারের খবর পৌঁছে দেয়।
ঘটনার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে আশপাশের নজরদারি ক্যামেরার ধারণ করা দৃশ্য। সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টারের ৩০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে তাঁর এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে চলাফেরার দৃশ্য পাওয়া গেছে। পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ হিসেবে শনাক্ত করেছেন। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ তাঁকে ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাবর রোড এলাকার একটি বাসা থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুধু হেফাজতে নেওয়ার অর্থ তাঁকে অপরাধী সাব্যস্ত করা নয়।
এই মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি ভিডিও। ওই দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময়কার একটি দৃশ্য ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে তাহসিফের নাম বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসে। ভিডিওটি কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে ধারণ করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে ভিডিওটি তাহসিফ নিজে ধারণ করেছিলেন, নাকি অন্য কারও ধারণ করা ভিডিও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা নিয়ে একাধিক বক্তব্য রয়েছে।
গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে ‘স্পিক উইথ রশিদ’ নামের একটি আলোচনাভিত্তিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন তাহসিফ। সেখানে তাঁকে ওই ভিডিও ধারণ ও প্রচারের অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, তা জানতে চান। নিজের চাকরি হারানোর সঙ্গে ওই অভিযোগের সম্পর্ক থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে তিনি সরাসরি স্বীকার করেননি যে ভিডিওটি নিজে ধারণ করেছিলেন কিংবা প্রচার করেছিলেন। বরং তাঁর বক্তব্যে অভিযোগের সত্যতা ও প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসে।
এদিকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে বিমানবাহিনীর কোনো সদস্যের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগের প্রসঙ্গও ওই আলোচনায় উঠে আসে। তাহসিফ এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সংবাদ প্রকাশের পর তিনি সামাজিকভাবে বিব্রত ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
বিমানবাহিনী থেকে তাঁর অব্যাহতির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, তাহসিফসহ দুই কর্মকর্তাকে বাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করে ভিন্ন পরিস্থিতিতে অবসর দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের অবসরের সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের সম্পর্ক নেই বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে তাহসিফের বাবা জানিয়েছেন, পরিবারকে তাঁর চাকরিচ্যুতির কারণ হিসেবে শৃঙ্খলাজনিত বিষয় জানানো হয়েছিল।
তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে মরদেহের ময়নাতদন্ত। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে দৃশ্যমান বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টি প্রতিবেদনে নথিভুক্ত করা হয়েছে। পেট ফোলা থাকার কথাও উল্লেখ রয়েছে। এসব লক্ষণ থেকে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসকেরা প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছেন। যকৃৎ, বৃক্ক, পাকস্থলী ও রক্তের নমুনার পাশাপাশি পরিচয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহের কথাও সংবাদ প্রতিবেদনে এসেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফল না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তদন্তের তথ্য হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় বক্তব্য দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। পরিবার জানিয়েছে, ঘটনার বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত তারা নেবে।
তাহসিফ সৌরীর মৃত্যু এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। কেন তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন, কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো, মৃত্যুর আগে কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল এবং ২০২৪ সালের আলোচিত ভিডিও নিয়ে অতীতে কোনো বিরোধ তাঁর জীবনে প্রভাব ফেলেছিল কি না এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ময়নাতদন্তের ফল, নজরদারি ক্যামেরার দৃশ্য, মুঠোফোনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ।
তবে প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এই মৃত্যুর জন্য দায়ী করা যায় না। তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে অপরাধমূলক কোনো ঘটনা রয়েছে কি না, তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তই এখন সবচেয়ে জরুরি।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।