বছরের পর বছর প্রকল্প ঝুলে থাকার অবসান চান প্রতিমন্ত্রী, ঢাকা ওয়াসাকে দুই মাসের সময়সীমা
ঢাকা ওয়াসার প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। আগামী দুই মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়নে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ আর গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। ঢাকা ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোতে আগামী দুই মাসের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ব্যর্থ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দাসেরকান্দি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে গুলশান, বনানী ও বারিধারা পর্যন্ত পাইপলাইন সংযোগ প্রকল্প দ্রুত শেষ করা এবং পূর্বাচলে পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ঢাকা ওয়াসা ভবনের সম্মেলনকক্ষে সংস্থাটির সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত পর্যালোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব নির্দেশনা দেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বন্ধের নির্দেশ
সভায় ঢাকা ওয়াসার প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, কোনো প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়নে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করা গ্রহণযোগ্য নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে জানান, আগামী দুই মাস পর তিনি আবারও ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রম পর্যালোচনা করবেন। এর মধ্যে চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চান তিনি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অগ্রগতি না হলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ব্যর্থ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।
ঢাকা মহানগরীর পানির চাহিদা পূরণ, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দাসেরকান্দি থেকে গুলশান, বনানী ও বারিধারায় পাইপলাইন সংযোগ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ
ঢাকা ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে দাসেরকান্দি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট থেকে গুলশান, বনানী ও বারিধারা অঞ্চলে পাইপলাইন সংযোগ প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
এ প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া পূর্বাচল এলাকায় পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের নির্দেশ দেন তিনি। পূর্বাচলের পানি সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও প্রকল্প প্রণয়নের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দেন প্রতিমন্ত্রী।
দেশের সব ওয়াসার বোর্ড বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত
ওয়াসার প্রশাসনিক কাঠামো নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি জানান, বর্তমান আইনে ওয়াসার বোর্ড গঠনের বিধান থাকলেও সরকার যেকোনো সময় বোর্ড গঠন বা ভেঙে দিতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ওয়াসার বোর্ড জনসেবামূলক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে এবং অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের কারণে কাজের গতি কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আইন সংশোধন করে সারা দেশের সব ওয়াসা থেকে বোর্ড বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার বলে জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগের লক্ষ্য ওয়াসার কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ কমানো এবং উন্নয়নমূলক কাজের গতি বাড়ানো।
ঢাকা মহানগরীতে পানির দৈনিক চাহিদা ৩১৪ কোটি লিটার
ঢাকা মহানগরীতে পানির দৈনিক চাহিদা ও সরবরাহ বর্তমানে ৩১৪ কোটি লিটার বলে সভায় উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, নগরীতে জনসংখ্যা ও বাসাবাড়ির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদাও বাড়ছে।
তবে গত সাত মাসে ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য নতুন উদ্ভাবন কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নগরীতে পানির সংকট তৈরি হলে তার দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। এ কারণে ঢাকা নগরবাসীর পানির চাহিদা পূরণে ওয়াসাকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ২০-২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য
ঢাকা ওয়াসার পানির উৎসের হিসাব তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সরবরাহ করা পানির ৭৪ শতাংশ আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে। বাকি ২৬ শতাংশ সরবরাহ করা হয় উপরিভাগের পানির উৎস থেকে।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে তা ২০ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানান তিনি। এ জন্য সারফেস ওয়াটার বা উপরিভাগের পানিনির্ভর প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন।
ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো এবং উপরিভাগের পানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে পানির সরবরাহব্যবস্থাকে আরও টেকসই করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
নিজস্ব রাজস্ব বাড়ানো ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর নির্দেশ
ঢাকা ওয়াসার আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি বলেন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওয়াসাকে সেবার মান বজায় রাখার পাশাপাশি নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব তহবিল থেকে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে মিটার রিডিং ও বিলিং কার্যক্রমে অটোমেশন জোরদার করার নির্দেশ দেন তিনি। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যক্রমের আধুনিকায়ন এবং রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২০৫০ সালের চাহিদা বিবেচনায় নতুন জনবল কাঠামো
ভবিষ্যতে ঢাকা মহানগরীর পানির চাহিদা এবং ওয়াসার কার্যক্রমের পরিধি বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির জনবল কাঠামো আধুনিকায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি ২০৫০ সালের চাহিদাকে সামনে রেখে ঢাকা ওয়াসার জন্য নতুন ও পূর্ণাঙ্গ জনবল কাঠামোর অর্গানোগ্রাম তৈরি করার নির্দেশ দেন। প্রস্তাবিত কাঠামো প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম, জনবল প্রয়োজন এবং সেবা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এ কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অবৈধ পানির সংযোগের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
ঢাকা মহানগরীর অবৈধ ও চোরাই পানির সংযোগ চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি বলেন, এসব অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ ছাড়া ওয়াসার মতো সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানে দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের সেবা ব্যাহত করা যাবে না বলে সতর্ক করেন তিনি। এ বিষয়ে সিবিএ এবং কর্মচারী সংগঠনগুলোর নেতাদেরও সতর্ক করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করাই ওয়াসার প্রধান দায়িত্ব। কোনো ধরনের দলীয় প্রভাব কিংবা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কারণে সেবা ব্যাহত হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
পানির অপচয় রোধে সচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ
পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নগরবাসীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি ব্রাশ করা বা শেভ করার সময় অপ্রয়োজনে পানির কল খোলা না রাখা এবং দৈনন্দিন কাজে পানির অপচয় বন্ধ করার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার চালানোর নির্দেশও দেওয়া হয়।
পানির অপচয় কমানো গেলে সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ কমবে এবং সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দুই মাস পর আবারও ওয়াসার কার্যক্রম পর্যালোচনা
সভায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আগামী দুই মাস পর তিনি ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রম পর্যালোচনা করতে আবারও আসবেন। এর মধ্যে সংস্থাটির কার্যক্রমে দৃশ্যমান ও আমূল পরিবর্তন দেখতে চান তিনি।
চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি, পানি সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ও ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে ঢাকা নগরবাসীকে পানির বিষয়ে স্বস্তির জায়গায় নিয়ে আসার লক্ষ্য তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহা. মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রকৌশলী সমিতি, ডিপ্লোমা অ্যাসোসিয়েশন ও সিবিএর নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীরা অংশ নেন।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।