যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে গোপনে ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম আনছে ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মধ্যেও ইরানের গোপন সামরিক আমদানি ব্যবস্থার বিস্তার নিয়ে রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে হাজারো প্রতিষ্ঠানের তথ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ অবরোধের মধ্যেও সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আমদানি অব্যাহত রেখেছে ইরান। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের একটি গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের সামরিক ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিদেশি মধ্যস্থতাকারী, আড়ালকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বিকল্প আর্থিক লেনদেনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে এসব আমদানি পরিচালিত হচ্ছে। ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এমওডি ৩৪৬৪২৮ নামে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠান একাই প্রায় ২৩০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি করেছে। তবে এই অর্থ পুরো গোপন নেটওয়ার্কের মোট আমদানির পরিমাণ নয়। বৃহত্তর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক এবং ভারী যানবাহন আমদানির তথ্য পেয়েছে রয়টার্স।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের নামের শুরুতে এমওডি শব্দটি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ঠিকানার সঙ্গে তেহরানে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনীর সরবরাহ বিভাগের ঠিকানার মিল পাওয়া গেছে। আশ্চর্যের বিষয়, অনেক প্রতিষ্ঠানের নথিতে প্রতিষ্ঠার তারিখ হিসেবে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ রয়েছে। অথচ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বাস্তবে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওই সময় ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়েছিল।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে বিদেশ থেকে পণ্য কেনার জন্য একটি বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতাকারী এবং বিদেশে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পণ্য কেনা হয়। ইরানের তেল বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশও এসব লেনদেনে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা চালানের ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রে কোনো আন্তর্জাতিক মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়াই লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ইরান থেকে সরাসরি বিদেশে অর্থ পাঠানোর পরিবর্তে বিদেশে থাকা অর্থ ব্যবহার করে মধ্যস্থতাকারীরা পণ্য কেনার ব্যবস্থা করেছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক নজরদারি এবং নিষেধাজ্ঞার বাধা এড়িয়ে পণ্য সংগ্রহ করা সহজ হয়েছে।
আমদানি করা পণ্যের তালিকায় রয়েছে রকেটের জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক উপাদান, বিস্ফোরক, বিস্ফোরণ ঘটানোর যন্ত্রাংশ, উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের অংশ, উন্নত শিল্পযন্ত্র, টাইটানিয়াম এবং ভারী ট্রাক। এসব উপকরণের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজ তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে সব পণ্য সরাসরি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কারণ এসব উপকরণের কয়েকটি বেসামরিক শিল্পেও ব্যবহার করা যায়।
পণ্য আমদানির উৎস হিসেবে চীন, রাশিয়া, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশের নাম উঠে এসেছে। স্থলপথে ট্রাক, কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে জাহাজ এবং আকাশপথে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে সরঞ্জাম ইরানে প্রবেশ করেছে। তবে কোনো দেশের নাম চালানের উৎস হিসেবে উল্লেখ থাকার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার সরাসরি ইরানকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে। বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
অনুসন্ধানে ভারী যানবাহন আমদানির বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। এমওডি ৩৪৬৪২৮ প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪৩৫টি আইভেকো ট্রাক আমদানি করেছে। রয়টার্সের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব ট্রাকের কয়েকটি মডেল সামরিক কাজে পরিবর্তন করে ক্ষেপণাস্ত্র বা চালকবিহীন উড়োজাহাজ উৎক্ষেপণের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। এ ছাড়া বিপুলসংখ্যক টয়োটা হাইলাক্স, ল্যান্ড ক্রুজার এবং অন্যান্য ভারী যানবাহন আমদানির তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে আমদানি করা প্রতিটি যানবাহন সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
এই গোপন নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং দেশটির কয়েকটি প্রভাবশালী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বিশেষ করে সাহারা থান্ডার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নেটওয়ার্কটির সংযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি ইরানের চালকবিহীন উড়োজাহাজ উৎপাদন ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্স এবং ইসরায়েলি-আমেরিকান ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ২৪০ অ্যানালিটিকস যৌথভাবে এই অনুসন্ধান পরিচালনা করেছে। এ জন্য ইরানের ব্যাংকিং নথি, সরকারি দলিল, ব্যবসায়িক নিবন্ধন এবং আমদানি-রপ্তানির তথ্য পরীক্ষা করা হয়। প্রায় ১৯ হাজার আমদানি নথির পাশাপাশি বিভিন্ন চালানপত্র ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সামরিক ও আর্থিক নেটওয়ার্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এবং উপকরণের সরবরাহ সীমিত করা। তবে রয়টার্সের অনুসন্ধান বলছে, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বিকল্প বাণিজ্যিক ও আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরান প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো রয়টার্সের বিস্তারিত প্রশ্নের জবাব দেয়নি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নির্দিষ্ট অভিযোগ সম্পর্কে অবগত নয় বলে জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি দায় স্বীকার করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অনুসন্ধান যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নজরদারির সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে। একটি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখলেও বিদেশি মধ্যস্থতাকারী, বিকল্প অর্থ পরিশোধব্যবস্থা এবং দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্যের সরবরাহ বন্ধ করা কঠিন হতে পারে।
তবে এই নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব ইরানের সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে, এমন প্রমাণ নয়। যুদ্ধ, সামরিক স্থাপনায় হামলা, সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং অর্থনৈতিক চাপ দেশটির উৎপাদন ও আমদানিকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সরঞ্জাম সংগ্রহ অব্যাহত থাকলেও তা দিয়ে সামরিক উৎপাদনের সব ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
ইরানের পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের এই গোপন আমদানি নেটওয়ার্ক মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের মধ্যেও বিকল্প পথে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন উড়োজাহাজ কর্মসূচিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে রয়েছে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।