শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনে ভারত কি পাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন?
মার্কো রুবিওর তিন দিনের ভারত সফরের পর পিটার হেগসেথ-রাজনাথ সিং বৈঠক; বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় অগ্রগতির আলোচনা।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে সাম্প্রতিক সময়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ২০ থেকে ২২ অক্টোবরের ভারত সফর এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার হেগসেথের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের বৈঠক দুই দেশের বাণিজ্যিক, জ্বালানিসংক্রান্ত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আলোচনায় এনেছে।
তবে বাণিজ্য ও শুল্কনীতি নিয়ে মতপার্থক্য পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। দুই দেশের সাম্প্রতিক যোগাযোগে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান বিরোধগুলো সমাধানের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।
মার্কো রুবিওর তিন দিনের ভারত সফর
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ২০ থেকে ২২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত ভারত সফর করেন। সফরের অংশ হিসেবে ২০ অক্টোবর মুম্বাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। এরপর তিনি গুজরাটের জামনগরে যান, যেখানে জ্বালানি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত বৈঠক-সংক্রান্ত বিবৃতি অনুযায়ী, রুবিও ও জয়শঙ্কর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নেওয়া, জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো, সরবরাহব্যবস্থার উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার অগ্রগতির বিষয়ও উঠে আসে।
রুবিও ভারতের মার্কিন প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেন। তাঁর জামনগর সফরে জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সূত্র: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর—২০ অক্টোবরের বৈঠক-সংক্রান্ত বিবৃতি | মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাপ্তাহিক পর্যালোচনা
বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
রুবিওর সফরের সময় ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ অক্টোবর বলেন, দুই দেশ একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার কাছাকাছি রয়েছে। রুবিওও জানান, চুক্তির কিছু বিষয় তখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ছিল।
রাশিয়ার জ্বালানি কেনা, শুল্কনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রভাব দুই দেশের অর্থনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের বড় পরিশোধন সক্ষমতা ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল কেনার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
রুবিওর ভারত সফরকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অগ্রগতির কথা জানানো হলেও রাশিয়ার তেল এবং শুল্কসংক্রান্ত মতপার্থক্য তখনো বিদ্যমান ছিল। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি মূল্যায়নে প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বাণিজ্যিক আলোচনার বাস্তব অগ্রগতিও বিবেচ্য।
সূত্র: রয়টার্স—ভারত ও উজবেকিস্তান সফর নিয়ে প্রতিবেদন | দ্য ফাইন্যানশিয়াল এক্সপ্রেস—রুবিওর ভারত সফর ও বাণিজ্য আলোচনা
পিটার হেগসেথ ও রাজনাথ সিংয়ের বৈঠক
রুবিওর সফরের পর ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও আলোচনায় আসে। ২৮ অক্টোবর ফিলিপাইনের সেবুতে আসিয়ান প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠক—এডিএমএম-প্লাসের সাইডলাইনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিটার হেগসেথ ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই দেশের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের কাঠামোর প্রথম বছর পূর্তি এবং সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনার কথা জানান।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে দুই দেশের ১০ বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামোর অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং সামরিক প্রযুক্তি, তথ্য বিনিময়, প্রতিরক্ষা শিল্প ও যৌথ সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয় উল্লেখ করা হয়।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে নতুন ১০ বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামো স্বাক্ষর করে। এর লক্ষ্য দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতার জন্য একটি নীতিগত ভিত্তি তৈরি করা।
সূত্র: ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় | যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর—প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের কাঠামো
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক কূটনৈতিক পরিবেশের একটি অংশ। তবে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি বা উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া থেকেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে তাদের অবস্থান বদলে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সমর্থন, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কিংবা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিষয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি বক্তব্য, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বাস্তব নীতিগত পদক্ষেপের প্রমাণ প্রয়োজন।
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বাণিজ্য, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রেক্ষাপটে। তবে প্রকাশিত বৈঠক-সংক্রান্ত বিবৃতিগুলোতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা কোনো নির্দিষ্ট দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের উল্লেখ নেই।
কূটনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী দিক
মার্কো রুবিওর ভারত সফরে বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা এবং পিটার হেগসেথ-রাজনাথ সিং বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব পর্যালোচনা—দুই দেশ সম্পর্কের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগাযোগ অব্যাহত রাখছে, তার প্রমাণ। একই সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্কসংক্রান্ত মতপার্থক্যের নিষ্পত্তি এবং আলোচিত সহযোগিতাগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।