বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণে বড় সুখবর, প্রস্তুতির জন্য আরও তিন বছর সময় দিল জাতিসংঘ
জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিতে আরও তিন বছর দিয়েছে; নতুন সময়সীমা ২৪ নভেম্বর ২০২৯, সংস্কারের সুযোগ বাড়ল।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতির সময় আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। এর ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের নতুন সময়সীমা পেয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব, জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি এবং দেশের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৩০ অক্টোবর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বাংলাদেশের জন্য অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। একই সিদ্ধান্তের আওতায় নেপালও তিন বছর অতিরিক্ত সময় পেয়েছে। উরুগুয়ে জি-৭৭ ও চীনের পক্ষে প্রস্তাবটি উত্থাপন করে। পরে সাধারণ পরিষদে কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। দীর্ঘ কয়েক দশকে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কৃষি ও রপ্তানি খাতে অগ্রগতির মাধ্যমে দেশটি তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। ২০১৮ সালে প্রথমবার জাতিসংঘের নির্ধারিত তিনটি সূচকেই বাংলাদেশ উত্তরণের প্রয়োজনীয় মান অর্জন করে। ২০২১ সালের পর্যালোচনাতেও সেই যোগ্যতা বজায় রাখে। ওই বছরের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সুপারিশ অনুমোদন করে।
সাধারণত উত্তরণের সিদ্ধান্তের পর প্রস্তুতির জন্য তিন বছর সময় দেওয়া হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত দুই বছর সময় দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী বাংলাদেশের উত্তরণের তারিখ নির্ধারিত ছিল ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। কিন্তু সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকার আরও সময় চায়।
২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘের উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করে। পরবর্তী সময়ে ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে এ বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে চিঠি পাঠান। আবেদনটি পর্যালোচনা করে উন্নয়ননীতিবিষয়ক কমিটি জানায়, বাংলাদেশের কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নিশ্চিত করার শর্তে সময় বাড়ানো যুক্তিসংগত হবে।
এরপর ২১ জুলাই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ সাধারণ পরিষদকে বাংলাদেশের আবেদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করে। সর্বশেষ ৩০ অক্টোবর সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের মাধ্যমে তিন বছর সময় বাড়ানোর বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।
বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে জি-৭৭ ও চীন সমর্থন জানায়। ফ্রান্স, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করা হয়। তবে সমর্থন জানানো দেশগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্বল্পোন্নত দেশের পরিচয়ের কারণে বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত ও পরিমাণগত বাধামুক্ত বাণিজ্যসুবিধা পেয়ে আসছে। উত্তরণের পর এসব সুবিধার কিছু পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন রপ্তানি খাত নতুন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ৩৮টি দেশ ও বাণিজ্যিক জোটে বাংলাদেশের পণ্য স্বল্পোন্নত দেশের বিশেষ সুবিধায় শুল্কমুক্ত বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়। দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশ এসব বিশেষ সুবিধার আওতায় রয়েছে। ফলে উত্তরণের সময় বাড়ায় রপ্তানিকারকেরা আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ পাবেন।
বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ এই শিল্প থেকে আসে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে বিদ্যমান বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখতে নতুন সমঝোতা, বাজার সম্প্রসারণ এবং পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিবর্তনের জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে।
তবে শুধু সময় বাড়লেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন।
জাতিসংঘ বাংলাদেশের জন্য জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এই কৌশলের আওতায় প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ করতে হবে। উত্তরণ প্রস্তুতির অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
উল্লেখ্য, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। তবে এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসুবিধা ও উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে। সব ধরনের সহায়তা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নয়; বরং বিভিন্ন সুবিধা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক নিয়ম ও দেশের নীতির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হবে।
জাতিসংঘের দেওয়া অতিরিক্ত তিন বছর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। এই সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব হলে উত্তরণের পরও দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখা সহজ হবে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ও রপ্তানি আয়ে চাপ তৈরি হতে পারে। তাই ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বরকে সামনে রেখে এখন থেকেই কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।