যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিষিদ্ধের প্রস্তাব, আইন ভাঙলে হতে পারে ২০ বছরের কারাদণ্ড
যুক্তরাষ্ট্রে অতিশক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে নতুন বিল, অনুমোদন পেলে নিয়ম ভাঙলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সর্বোচ্চ বিশ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে প্রস্তাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগামহীন বিকাশ নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এমন অতিশক্তিশালী প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন দেশটির আইনপ্রণেতারা। এ লক্ষ্যে নতুন একটি আইন প্রস্তাব করেছেন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও প্রতিনিধি গ্রেগ কাসার। প্রস্তাবিত আইনে কৃত্রিম অতিবুদ্ধিমত্তা তৈরি ও ব্যবহারের ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে সাময়িক বিরতি এবং কঠোর সরকারি নজরদারির কথা বলা হয়েছে। আইনটি অনুমোদিত হলে নির্দিষ্ট পর্যায়ের নীতিনির্ধারণী কর্মকর্তা ও স্বতন্ত্রভাবে আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তির সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি আইনপ্রণয়ন সংক্রান্ত নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স সিনেটে ‘কৃত্রিম অতিবুদ্ধিমত্তা নিষিদ্ধকরণ আইন, ২০২৬’ উত্থাপন করেন। বিলটির নম্বর এস ৫৪৯৩। একই উদ্যোগের প্রতিনিধি পরিষদের সংস্করণটি ২৪ সেপ্টেম্বর প্রতিনিধি গ্রেগ কাসার উত্থাপন করেন। সেটির নম্বর এইচ আর ১০৫৩৮। দুটি বিলই সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিনিধি পরিষদে গ্রেগ কাসারের উত্থাপিত বিলের সহ-উদ্যোক্তাদের মধ্যে রয়েছেন রো খান্না, আনালিয়া মেহিয়া, ইয়াসামিন আনসারি, ভ্যাল হোয়েল, স্টিফেন লিঞ্চ, ক্রিস্টোফার ডেলুজিও, আদেলিতা গ্রিজালভা এবং নিডিয়া ভেলাসকেজ। অ্যারিজোনার প্রতিনিধি ইয়াসামিন আনসারিও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
আনসারির বক্তব্য অনুযায়ী, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে বিরতি এবং কৃত্রিম অতিবুদ্ধিমত্তা নিষিদ্ধ করার বিষয়টি ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
প্রস্তাবিত আইনের মূল লক্ষ্য এমন প্রযুক্তির বিকাশ বন্ধ করা, যা মানুষের চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শেখা এবং বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোজনের ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। আইনটির সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা যদি অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষের জ্ঞানীয় সক্ষমতাকে অতিক্রম করে অথবা মানবজাতির ধ্বংস কিংবা মানুষের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সামর্থ্য অর্জন করে, তাহলে সেটি অতিবুদ্ধিমান প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিলটিতে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। নতুন সরকারি বিভাগ পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করা এবং নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক প্রয়োজনীয় বিধিমালা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই বিরতি বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন একটি কেন্দ্রীয় সরকারি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হবে, যার নাম হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাগ। এটি উন্নত প্রযুক্তির বিকাশ, নিরাপত্তা পরীক্ষা, ব্যবহার এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করবে। বিভাগটির প্রধান রাষ্ট্রপতির মনোনয়নে নিয়োগ পাবেন এবং সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি পরামর্শক বোর্ড গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
এই বিভাগের অন্যতম দায়িত্ব হবে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা যাচাই করা। প্রযুক্তি তৈরির আগে পরিকল্পনা জমা দেওয়া, বিকাশের সময় নিয়মিত পরীক্ষা, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিরীক্ষা এবং সাধারণ মানুষের ব্যবহারের আগে চূড়ান্ত অনুমোদন নেওয়ার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিলটিতে বিশেষভাবে এমন প্রযুক্তির ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা মানুষের বন্ধ করার নির্দেশ অমান্য করেও নিজস্ব কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া নিজেকে পরিবর্তন বা উন্নত করার ক্ষমতা, অনুমতি ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোয় প্রবেশ এবং মানুষের নজরদারি এড়িয়ে চলার সক্ষমতাকেও সম্ভাব্য বিপদের লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির বিকাশ তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত এবং ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষমতা নতুন বিভাগের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য দূর করা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা অকার্যকর করে দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।
আইনটির সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো শাস্তির বিধান। প্রস্তাবিত আইনের ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি অথবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা কোনো ব্যক্তি যদি বেপরোয়াভাবে নির্ধারিত নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ম লঙ্ঘন করেন, তাহলে তাঁর সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানা হতে পারে। তবে এই শাস্তি প্রত্যেক কর্মীর জন্য প্রযোজ্য নয়। নীতিনির্ধারণী দায়িত্বে নেই এমন কর্মীদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে ১০ বছর কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞার বিধান রাখা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও কঠোর ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভঙ্গ করলে তার অনুমোদনপত্র বাতিল করা হতে পারে। আদালতে আপিলের সুযোগ থাকবে। আদালত অভিযোগ বহাল রাখলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মেধাস্বত্ব ও সম্পদ সরকারের কাছে বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে, যাতে নিয়মবহির্ভূত প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণ অকার্যকর করা যায়। রাজনৈতিক আলোচনায় এই কঠোর ব্যবস্থাকে করপোরেট মৃত্যুদণ্ড হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া কৃত্রিম অতিবুদ্ধিমত্তা তৈরির ঝুঁকি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখার কথাও বলা হয়েছে। মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং প্রযুক্তি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী এ ধরনের প্রযুক্তির বিস্তার ঠেকানোর নীতিগত অবস্থান প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যকেন্দ্র নিয়েও ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা গেছে। এনবিসি নিউজের নির্বাচনী জরিপের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেস নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ ভোটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্রকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথবা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এর মধ্যে ২৩ শতাংশ একে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ৩৩ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন।
তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়েও বিরোধিতা রয়েছে। জরিপে ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা নিজেদের এলাকায় নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমাজের জন্য উপকারের তুলনায় ক্ষতি বেশি করতে পারে বলে মনে করেছেন ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা। এসব তথ্য প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরছে।
তবে আইনপ্রণেতাদের এই উদ্যোগের বিরোধিতাও তৈরি হতে পারে। প্রযুক্তি খাতের অনেকের আশঙ্কা, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ গবেষণা, উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যক্তিরা মনে করছেন, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া প্রযুক্তির বিকাশ ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রস্তাব এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর আইন নয়। সিনেটের বিলটি বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও পরিবহনবিষয়ক কমিটিতে এবং প্রতিনিধি পরিষদের বিলটি তদারকি ও সরকারি সংস্কারবিষয়ক কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। আইন হিসেবে কার্যকর হতে হলে উভয় কক্ষে অনুমোদন এবং রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর প্রয়োজন।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যখন দ্রুত বাড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। শেষ পর্যন্ত বিলটি অনুমোদন পাবে কি না, তা নির্ভর করছে কংগ্রেসের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর। তবে এই উদ্যোগ স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি মানবনিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও এখন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।