মেক্সিকো সীমান্তে ভোটের জোয়ার, টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক জয়ে বদলে গেল রাজনৈতিক সমীকরণ
মেক্সিকো সীমান্তবর্তী ১৬ কাউন্টিতে ভোটার উপস্থিতি বেড়েছে, ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ে টেক্সাসের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে এসেছে পরিবর্তন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের মেক্সিকো সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে সীমান্তবর্তী কাউন্টিগুলোতে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধির পাশাপাশি ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যটিতে এই ফলাফল নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
৪ নভেম্বর প্রকাশিত টেক্সাস ট্রিবিউনের নির্বাচনী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী এল পাসো থেকে ক্যামেরন পর্যন্ত বিস্তৃত ১৬টি কাউন্টিতে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের তুলনায় সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতি ৮ শতাংশ বেড়েছে। অঙ্গরাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এই বৃদ্ধির হার ছিল সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকার ভোটারদের বড় অংশ ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন করেছেন।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব সীমান্তবর্তী কাউন্টিতে জয় পেয়েছিলেন, সেগুলোর একাধিক এলাকায় এবার ডেমোক্র্যাটরা শক্ত অবস্থান ফিরে পেয়েছেন। ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী জেমস টালারিকো সীমান্তবর্তী ১৬টি কাউন্টির মধ্যে নয়টিতে জয় পেয়েছেন, যেসব এলাকায় দুই বছর আগে ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন।
নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সীমান্তবর্তী ১৬টি কাউন্টিতে টালারিকো প্রায় ৪৫ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। ২০১৮ সালের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বেটো ও’রুর্ক এসব এলাকায় ৪০ শতাংশ পয়েন্টের কিছু বেশি ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। অর্থাৎ আট বছর আগের নির্বাচনের তুলনায় এবার ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
দক্ষিণ টেক্সাসের রিও গ্র্যান্ডে উপত্যকা এবং লারেডো অঞ্চলের কাউন্টিগুলোতে এই পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জাপাটা কাউন্টিতে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোটের প্রবণতায় ১৫ শতাংশ পয়েন্টের বেশি পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০১৮ সালে বেটো ও’রুর্ক সেখানে প্রায় ২৬ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। এবারের ফলাফল দক্ষিণ টেক্সাসের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ব্যাপকতা তুলে ধরেছে।
দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ টেক্সাসের হিস্পানিক জনগোষ্ঠী ডেমোক্র্যাটদের গুরুত্বপূর্ণ ভোটার হিসেবে পরিচিত। তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি কাউন্টিতে ট্রাম্পের জয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিস্মিত করেছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর অভিবাসন নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ওই এলাকার অনেক ভোটারের সমর্থন পেয়েছিলেন।
কিন্তু দুই বছরের ব্যবধানে সেই রাজনৈতিক সমর্থনে পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয়, খাদ্যপণ্যের দাম, জ্বালানি খরচ এবং কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পার্থক্য সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেরোনিমো কর্টিনা মনে করেন, দক্ষিণ টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের আগের দুর্বলতার একটি কারণ ছিল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পর্যাপ্ত যোগাযোগ ও রাজনৈতিক বিনিয়োগের অভাব। এবারের নির্বাচনে দলটি সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ করেছে এবং স্থানীয় সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে।
অভিবাসননীতিও নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। দক্ষিণ টেক্সাসের অর্থনীতি অভিবাসী শ্রমিক, নির্মাণশিল্প, আবাসন প্রকল্প এবং স্থানীয় ব্যবসার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযানের কারণে কিছু এলাকায় নির্মাণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষকেরা জানিয়েছেন।
টেক্সাস রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আলভারো কোরাল বলেছেন, দক্ষিণ টেক্সাসে অভিবাসন শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। অভিবাসন অভিযান এবং শ্রমিক সংকটের প্রভাব আবাসন প্রকল্প ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে পড়তে পারে। ফলে এই বিষয়টি ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠিত প্রচারণাও ভূমিকা রেখেছে। লা ইউনিয়ন দেল পুয়েবলো এন্তেরোর রাজনৈতিক সংগঠন লুপে ভোটস রিও গ্র্যান্ডে উপত্যকায় নতুন ও অনিয়মিত ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনতে প্রচারণা চালায়। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত তাদের কর্মীরা প্রায় ৯০ হাজার বাড়িতে গিয়ে যোগাযোগ করেন এবং এক লাখের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছান।
এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য শুধু সীমান্তবর্তী কাউন্টিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দলটি টেক্সাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কংগ্রেশনাল আসনও পুনরুদ্ধার করেছে। এর মধ্যে ম্যাকঅ্যালেন অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত ১৫ নম্বর আসন এবং সান আন্তোনিও থেকে এল পাসো পর্যন্ত বিস্তৃত ২৩ নম্বর আসন রয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের সাফল্যের পর রিপাবলিকানরা দক্ষিণ টেক্সাসে রাজনৈতিক সীমানা পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এবারের ফলাফল তাদের সেই কৌশলের প্রত্যাশিত সাফল্যকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
টেক্সাসের গভর্নর নির্বাচনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি টেক্সাসের প্রথম লাতিনা নারী গভর্নর হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন। ১৯৯০ সালে অ্যান রিচার্ডসের পর টেক্সাসে আবার একজন ডেমোক্র্যাট গভর্নরের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, জেমস টালারিকোর সিনেট জয়ও ডেমোক্র্যাটদের জন্য ঐতিহাসিক সাফল্য। দীর্ঘ প্রায় চার দশক পর টেক্সাস থেকে একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। এই জয় অঙ্গরাজ্যটির জাতীয় রাজনীতিতে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এবারের সাফল্য ধরে রাখা ডেমোক্র্যাটদের জন্য সহজ হবে না। সীমান্তবর্তী এলাকার ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে হলে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, অভিবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় উন্নয়নের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে আবারও ভোটের সমীকরণ পরিবর্তিত হতে পারে।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে টেক্সাসের মেক্সিকো সীমান্তবর্তী ১৬টি কাউন্টিতে ভোটার উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন বার্তা দিয়েছে। ২০২৪ সালে রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে পড়া সীমান্তবর্তী ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করেছেন। এই পরিবর্তন আগামী দিনের মার্কিন রাজনীতিতে কতটা স্থায়ী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের পর দলগুলোর কার্যক্রম ও জনসাধারণের প্রত্যাশা পূরণের ওপর।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।