ফ্লোরিডায় সিটিব্যাংকে বন্দুকধারীর হামলা, প্রাণ গেল দুইজনের, আহত আরও চারজন কর্মী।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় সিটিব্যাংকের কার্যালয়ে বন্দুক হামলায় নারী কর্মী ও হামলাকারী নিহত, আহত চারজন; আতঙ্কে ভবন ছেড়ে পালান শত শত কর্মী।
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পা শহরের কাছে সিটিব্যাংকের বিশাল কার্যালয় চত্বরে বন্দুকধারীর হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন নারী কর্মী এবং অপরজন হামলাকারী। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চারজন। বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে ঘটে যাওয়া এই সহিংস ঘটনায় কয়েক হাজার কর্মীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে কর্মীরা ভবন থেকে বেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে থাকেন।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, টাম্পার উপশহর ব্র্যান্ডন এলাকার ৩৮০০ সিটিব্যাংক সেন্টারে অবস্থিত সাবাল সেন্টারে এ হামলার ঘটনা ঘটে। দুপুর ১২টা ১১ মিনিটে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের জরুরি সেবা কেন্দ্রে গুলির শব্দ ও হামলার খবর আসতে শুরু করে। খবর পাওয়ার এক মিনিটের মধ্যেই পুলিশের প্রথম গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পরে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সেখানে উপস্থিত হন।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারী একটি গাড়ি চালিয়ে কার্যালয় চত্বরের প্রবেশপথের বেড়া ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন। এরপর তিনি একটি রাইফেল দিয়ে গুলি চালাতে শুরু করেন। ওই সময় চত্বরে থাকা বাইরের খাবার খাওয়ার জায়গায় কর্মীরা দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন। হঠাৎ গুলির শব্দে সেখানে উপস্থিত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে ভবনের ভেতরে আশ্রয় নেন, আবার কেউ কেউ নিরাপদে বের হওয়ার পথ খুঁজতে থাকেন।
হিলসবরো কাউন্টির শেরিফের দপ্তরের প্রধান উপপ্রধান ফ্রাঙ্ক লোসাট জানান, হামলাকারী পরে ভবনের খাবার ঘরের দিকে এগিয়ে যান। সেখানে সিটিব্যাংকের একজন সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী তাঁকে বাধা দেন। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। নিরাপত্তারক্ষীর গুলিতে হামলাকারী গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে দুপুর ১টা ১২ মিনিটে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, হামলাকারীর গুলিতে আহত এক নারী ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহত নারী ও হামলাকারীর পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। তাঁদের মধ্যে আগে থেকে কোনো পরিচয় বা বিরোধ ছিল কি না, সেটিও নিশ্চিত করা যায়নি।
এই হামলায় আরও চারজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাঁদের আঘাত প্রাণঘাতী নয়। তবে তাঁরা সরাসরি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, নাকি হামলাকারীর গাড়ির ধাক্কায় কিংবা আতঙ্কের মধ্যে পালানোর সময় আহত হয়েছেন, তা প্রাথমিক প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।
ঘটনার সময় সিটিব্যাংকের ওই কার্যালয় চত্বরে প্রায় তিন হাজার দুইশ কর্মী উপস্থিত ছিলেন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, বিশেষ অভিযান দল, আকাশপথে নজরদারি ইউনিট, চালকবিহীন উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী দল এবং প্রশিক্ষিত কুকুরসহ বিভিন্ন ইউনিট মোতায়েন করা হয়। শেরিফের দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, মোট ৩৬৭ জন ডেপুটি শেরিফ ঘটনাস্থলে কাজ করেন। অন্যান্য সংস্থার সদস্যদের যুক্ত করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোট উপস্থিতি চার শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।
পুলিশ কর্মকর্তারা হামলার পর ভবনগুলোতে ব্যাপক তল্লাশি চালান। কোনো অতিরিক্ত হামলাকারী কিংবা অন্য কোনো বিপদের আশঙ্কা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে একাধিক ভবন ও পার্কিং এলাকার প্রতিটি তলা পরীক্ষা করা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে ভবনগুলো নিরাপদ ঘোষণা করার কাজ শেষ হয় বলে শেরিফের দপ্তর জানিয়েছে।
এদিকে, হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কর্মীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। অনেক কর্মী কাছাকাছি অবস্থিত শেরাটন টাম্পা ব্র্যান্ডন হোটেলে আশ্রয় নেন। হোটেল কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, সেখানে প্রায় তিনশ কর্মীকে সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়া হয়। তাঁদের পানি, খাবার এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়া হয়।
হামলার প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে আতঙ্কের ভয়াবহ চিত্র। সিটিব্যাংকের একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভিড ডিজেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, দুপুরের খাবার শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় তিনি একটি গাড়িকে বেড়া ভেঙে ভেতরে ঢুকতে দেখেন। এরপরই প্রচণ্ড গুলির শব্দ শুনতে পান। আশপাশের মানুষকে ছোটাছুটি করতে দেখে তিনিও দ্রুত ভবনের ভেতরে ফিরে যান এবং জরুরি বহির্গমন পথ দিয়ে বেরিয়ে আসেন।
হিলসবরো কাউন্টির শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ঘটনাটিকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হামলা বলে মনে করছেন। তবে হামলার উদ্দেশ্য, হামলাকারীর পরিচয় এবং নিহত নারীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি।
এ ঘটনায় সিটিগ্রুপ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেন ফ্রেজার কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো বার্তায় বলেন, ঘটনার বিস্তারিত জানতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। টাম্পার কার্যালয় চত্বর বর্তমানে নিরাপদ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য কার্যালয়েও নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে।
শেরিফের দপ্তর ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ভিডিও বা তথ্য থাকলে তা তদন্তকারীদের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। হামলার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনাটি আবারও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মক্ষেত্র ও বড় প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যেখানে একসঙ্গে কয়েক হাজার মানুষ কাজ করেন, সেখানে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।