কলোরাডোর দুর্গম পাহাড়ে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু, ময়নাতদন্তে বেরিয়ে এলো ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ
কলোরাডোর দুর্গম পাহাড়ে দড়ির নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রাণ হারান দুই কলেজ শিক্ষার্থী; ময়নাতদন্তে গুরুতর আঘাতের প্রমাণ মিলেছে মৃত্যুর নিশ্চিতভাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালাতে গিয়ে প্রাণ হারানো দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ প্রকাশ করেছে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ। ময়নাতদন্তে জানা গেছে, পাহাড়ের খাড়া পাথুরে অংশে দড়ির সাহায্যে নিচে নামার সময় তাদের ব্যবহৃত নিরাপত্তাব্যবস্থায় ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে। নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা বাঁধন ভেঙে যাওয়ায় দুই তরুণ অনেক উঁচু থেকে নিচে পড়ে যান। গুরুতর আঘাতের কারণে ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।
নিহত দুই শিক্ষার্থীর একজন ১৯ বছর বয়সী কেডেন মাতসুদা এবং অন্যজন ২০ বছর বয়সী জ্যাকসন ডনলন। তারা দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো মাউন্টেন কলেজের লিডভিল শাখার শিক্ষার্থী ছিলেন। পাহাড়, প্রকৃতি ও দুঃসাহসিক অভিযানের প্রতি গভীর আগ্রহ থেকেই তারা একসঙ্গে পাহাড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
চাফি কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় এবং কাউন্টির মৃতদেহ পরীক্ষকের কার্যালয়ের যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, গত ২ নভেম্বর তাদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এতে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে একাধিক গুরুতর আঘাত শনাক্ত করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের মৃত্যু তাৎক্ষণিকভাবে ঘটেছিল।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, জ্যাকসন পাহাড়ের পাথুরে অংশে স্থাপন করা একটি প্রধান নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহার করে দড়ির সাহায্যে নিচে নামতে শুরু করেছিলেন। ওই ব্যবস্থায় প্রধান বাঁধনের পাশাপাশি অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য একটি ধাতব পেরেকজাতীয় উপকরণ এবং পাথরের সঙ্গে যুক্ত দ্বিতীয় একটি বাঁধনও ছিল।
অন্যদিকে কেডেন নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সংযোগযন্ত্রের মাধ্যমে একই বাঁধনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে দুই শিক্ষার্থীর নিরাপত্তাই নির্ভর করছিল একই সংযোগব্যবস্থার ওপর।
তদন্তে উঠে এসেছে, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থায় ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে। প্রধান বাঁধনব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার পর দুই শিক্ষার্থীই অনেকটা নিচে পড়ে যান। ঠিক কত দূরত্ব থেকে তারা পড়েছিলেন, তা নির্ধারণ করতে পারেননি তদন্তকারীরা। একই সঙ্গে কী কারণে নিরাপত্তাব্যবস্থাটি ভেঙে পড়েছিল, সেটিও এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক হয়ে ওঠে দুই শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়ার পর। গত ২৩ অক্টোবর তারা কলোরাডো মাউন্টেন কলেজের লিডভিল শাখা থেকে পাহাড়ে অভিযানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল আইস মাউন্টেন আরোহণ করা। তবে পরবর্তী অনুসন্ধান ও তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, তারা শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট অ্যাপোস্টল মাউন্টেনের দিকে অভিযান চালিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়েস্ট অ্যাপোস্টল মাউন্টেনের উচ্চতা প্রায় ১৩ হাজার ৫৯৭ ফুট। এটি কলোরাডোর দুর্গম পাহাড়ি এলাকার একটি উঁচু পর্বতশৃঙ্গ। সেখানে আরোহণের জন্য বিশেষ দক্ষতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং উপযুক্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়।
নির্ধারিত সময়ে দুই শিক্ষার্থী ফিরে না আসায় ২৬ অক্টোবর তাদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরে তাদের গাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। অনুসন্ধানকারীরা পাহাড়ের কাছাকাছি লেক অ্যান এলাকার একটি তাঁবুও খুঁজে পান। তাঁবুটি তুষারের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল।
এদিকে ওই অঞ্চলে প্রবল তুষারপাত শুরু হওয়ায় উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়ে। পাহাড়ি এলাকায় এক থেকে দুই ফুট পর্যন্ত বরফ জমেছিল। দুর্গম পথ, বরফে ঢাকা পাথুরে অঞ্চল এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনুসন্ধানকারীদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করতে হয়।
গত ২৮ অক্টোবর ওয়েস্ট অ্যাপোস্টল মাউন্টেনের একটি বরফে ঢাকা উপত্যকায় দুই শিক্ষার্থীর মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। পরদিন ২৯ অক্টোবর উদ্ধারকর্মীরা দুর্গম এলাকা থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করেন। তাদের মরদেহ তাঁবু থেকে প্রায় এক মাইল দূরে পাওয়া গিয়েছিল।
তবে মৃত্যুর ঘটনায় তুষারঝড়ের ভূমিকা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রবল তুষারপাত উদ্ধার অভিযানকে জটিল করে তুললেও সেটি সরাসরি দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ ছিল না। আবহাওয়া দুর্ঘটনার আগের পরিস্থিতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
চাফি কাউন্টির শেরিফ অ্যান্ডি রোরিচ দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, কেডেন ও জ্যাকসন ছিলেন এমন দুই তরুণ, যারা পাহাড়ের চূড়ায় স্বাধীনতা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য খুঁজে বেড়াতেন। তারা নিজেদের পছন্দের কাজের মধ্য দিয়েই জীবন কাটাতে ভালোবাসতেন।
শেরিফ আরও জানান, এ ধরনের দুর্ঘটনার পর সাধারণত কী ভুল হয়েছিল, তা খুঁজে বের করা সম্ভব হয়। কিন্তু কেডেন ও জ্যাকসনের ক্ষেত্রে তদন্তকারীরা তাদের প্রস্তুতি বা পরিকল্পনায় কোনো স্পষ্ট ভুল খুঁজে পাননি। তাদের যথাযথ প্রস্তুতি এবং পাহাড়ি অভিযানের প্রতি আগ্রহের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
নিহত কেডেন মাতসুদা কলোরাডোর রিডওয়ে এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি বন্য পরিবেশে অগ্নিনির্বাপণকর্মী হিসেবে ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য পড়াশোনা করছিলেন। পাহাড়ি বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল।
অন্যদিকে জ্যাকসন ডনলন নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের কুইন্সবারি এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি পাহাড়ি পর্যটন, বহিরাঙ্গন অভিযান পরিচালনা এবং পর্বতারোহণসংক্রান্ত পেশায় ভবিষ্যৎ গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাহাড়ে আরোহণ ও স্কিইং ছিল তার বিশেষ পছন্দের বিষয়।
কলোরাডো মাউন্টেন কলেজের লিডভিল শাখায় পড়াশোনার সময় তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা এবং একই ধরনের আগ্রহ তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। একসঙ্গে অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্তও সেই বন্ধুত্বেরই অংশ ছিল।
কলোরাডোর পাহাড়ি অঞ্চলে এ ধরনের অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে উঁচু পাথুরে স্থানে দড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় প্রতিটি নিরাপত্তা সংযোগ, পাথরের ধারণক্ষমতা এবং অতিরিক্ত বাঁধনের কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি অংশে ত্রুটি দেখা দিলে পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।
এই দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, যথাযথ প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও পাহাড়ি অভিযানে ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে কর্তৃপক্ষের তদন্তে দুই শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি বা আচরণে কোনো স্পষ্ট ভুলের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দুই তরুণের আকস্মিক মৃত্যুতে তাদের পরিবার, সহপাঠী ও কলেজের শিক্ষকরা গভীর শোকের মধ্যে রয়েছেন। তাদের স্মরণ করে শেরিফের কার্যালয় জানিয়েছে, পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা এবং দুঃসাহসিক অভিযানের আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়েই তারা নিজেদের জীবন গড়তে চেয়েছিলেন।
ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট হলেও নিরাপত্তার বাঁধনটি ঠিক কী কারণে ভেঙে পড়েছিল, তা এখনো অজানা। তদন্তকারীদের কাছে এটিই দুর্ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দুই তরুণের মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পাহাড়ি অভিযানপ্রেমী সমাজেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।