অংশ: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০২৬
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে বড় তদন্তে নামছে ডেমোক্র্যাটরা
মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয় পেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ডেমোক্র্যাটরা, অভিবাসননীতি, ব্যবসা ও সরকারি নথি থাকবে নজরদারিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের বিজয়ের পর কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এই জয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলটির আইনপ্রণেতারা। অভিবাসন কার্যক্রম, সরকারি অর্থের ব্যবহার, ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ, প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড এবং জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি তদন্তের সম্ভাব্য অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে এসেছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর ডেমোক্র্যাট নেতাদের বক্তব্যে প্রশাসনের প্রতি কঠোর নজরদারির স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
৪ নভেম্বর প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদের নজরদারি কমিটির সম্ভাব্য নতুন চেয়ারম্যান রবার্ট গার্সিয়া ট্রাম্প প্রশাসন ও রিপাবলিকানদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বার্তা দিয়েছেন—‘আইনজীবী প্রস্তুত রাখুন’। তাঁর এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের নথি তলব, শুনানি এবং জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
রবার্ট গার্সিয়া জানিয়েছেন, তদন্তের প্রস্তুতি একেবারে নতুন নয়। গত কয়েক মাস ধরেই এ বিষয়ে কাজ চলছে। তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকাণ্ড, করপোরেট দুর্নীতির অভিযোগ এবং জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ ও সংরক্ষণের বিষয়টি খতিয়ে দেখা। নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে এসব বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর রন ওয়াইডেনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি শব্দ লিখে তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন—‘সমন’। সিনেটের অর্থসংক্রান্ত কমিটির নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনায় থাকা ওয়াইডেনের এই বক্তব্যকে প্রশাসনের আর্থিক কর্মকাণ্ড ও সরকারি ব্যয়ের ওপর কঠোর নজরদারির বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাঁর বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে সমন জারি করা হয়েছে।
তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কার্যক্রম। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতি, অভিবাসীদের আটক, আটককেন্দ্র পরিচালনা, অভিবাসন কর্মকর্তাদের আচরণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ডেমোক্র্যাটরা। বিশেষ করে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও সীমান্ত নিরাপত্তা কার্যক্রমে বরাদ্দ করা বিপুল অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে চান তাঁরা।
অভিবাসীদের আটককেন্দ্র পরিচালনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, সরকারি অর্থের বিনিময়ে সেবা প্রদান, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আসতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও তদন্তের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে। প্রেসিডেন্টের সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থের কোনো সংঘাত তৈরি হয়েছে কি না, বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক চুক্তিতে সরকারি প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে কি না এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ব্যক্তিগত আর্থিক স্বার্থের সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে চান ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। এসব বিষয়ে অভিযোগ ও প্রশ্ন থাকলেও তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী বলা যাবে না।
জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিও নতুন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। অতীতে যৌন অপরাধের দায়ে দণ্ডিত ও পরে কারাবন্দি অবস্থায় মারা যাওয়া এপস্টেইনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ, তদন্তের নথি এবং সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে ডেমোক্র্যাটরা আরও তথ্য প্রকাশের দাবি তুলতে পারেন। কোন নথি প্রকাশ করা হয়েছে, কোন তথ্য গোপন রাখা হয়েছে এবং গোপন রাখার পেছনে আইনগত কারণ রয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হতে পারে। তবে কোনো নথিতে কারও নাম থাকলেই তাঁকে অপরাধে জড়িত বলা যায় না।
এদিকে সরকারি নথি সংরক্ষণের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদের শিক্ষা ও শ্রমবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট ববি স্কট। ৪ নভেম্বর তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের দশটি দপ্তর ও সংস্থার প্রধানদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সরকারি নথি যথাযথভাবে সংরক্ষণের নির্দেশনা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে লিখিত নিশ্চয়তা চেয়েছেন যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর প্রয়োজনীয় নথি, তথ্য ও দলিল সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও করা হবে।
ববি স্কট তাঁর চিঠিতে ১৯৫০ সালের কেন্দ্রীয় সরকারি নথি সংরক্ষণ আইনের কথা উল্লেখ করেছেন। ওই আইনে সরকারি কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সিদ্ধান্তসংক্রান্ত নথি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি নথি গোপন, অপসারণ, বিকৃত বা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জরিমানা কিংবা সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এই চিঠিকে নতুন কংগ্রেসের তদন্ত কার্যক্রমের আগে সরকারি নথি সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসের তদন্তসংক্রান্ত ক্ষমতা বাড়াবে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের বিভিন্ন কমিটি সরকারি কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শুনানিতে হাজির হতে বলতে পারে, নথি তলব করতে পারে এবং আইন অনুযায়ী সমন জারি করতে পারে। তবে এসব ক্ষমতার ব্যবহারও নির্দিষ্ট আইন ও সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সমন অমান্য করলে বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। আবার প্রশাসন নির্বাহী বিশেষাধিকার বা অন্যান্য আইনি যুক্তিতে কিছু নথি দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। সে ক্ষেত্রে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেও ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের সব ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা এবং কংগ্রেসে পাস হওয়া বিলে ভেটো দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার থাকবে। ফলে প্রশাসনের সঙ্গে আইনপ্রণেতাদের বিরোধ আরও বাড়তে পারে। তদন্ত, শুনানি, নথি তলব এবং আদালতকেন্দ্রিক আইনি লড়াই আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্যকে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, ইরান যুদ্ধ এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আর ট্রাম্প প্রশাসনকে আগামী দিনগুলোতে কংগ্রেসের কঠোর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে পারে। তবে তদন্তের ঘোষণা, সমন জারি এবং অপরাধ প্রমাণ তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আগামী বছরের জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে এসব পরিকল্পনার বাস্তব অগ্রগতি স্পষ্ট হবে।










মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।