স্কুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বন্ধ করলে শিক্ষার্থীরা গুগল সার্চও ব্যবহার করতে পারবে না
স্কুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বন্ধ রাখলে শিক্ষার্থীদের গুগল সার্চ ব্যবহারের সুযোগও বন্ধ হতে পারে। গুগলের নতুন নিয়ম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে নতুন ব্যবস্থা নিচ্ছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল। তবে এই সিদ্ধান্তের কারণে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গুগল জানিয়েছে, কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের এআই সুবিধা পুরোপুরি বন্ধ রাখলে সেই শিক্ষার্থীরা গুগল সার্চও ব্যবহার করতে পারবে না। কারণ গুগলের সার্চ ব্যবস্থার সঙ্গে এআই প্রযুক্তি এখন গভীরভাবে যুক্ত।
গত ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার গুগল তাদের শিক্ষাবিষয়ক প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়মে পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়। নতুন ব্যবস্থায় স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্টে গুগলের এআই সুবিধা এবং সার্চ বন্ধ থাকবে। স্কুল কর্তৃপক্ষ চাইলে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব সুবিধা চালু করতে পারবে।
এই পরিবর্তনের আওতায় রয়েছে গুগলের এআই সহকারী জেমিনি, নোটবুকএলএম, গুগল ক্লাসরুমের এআই সুবিধা এবং গুগল সার্চ। স্কুল কর্তৃপক্ষ কোন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কোন সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে, সেটিও নির্ধারণ করতে পারবে।
গুগলের শিক্ষাবিষয়ক বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিস ফিলিপস বলেছেন, স্কুলগুলো তাদের শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহারের বিষয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। শিক্ষক ও স্কুল কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ দেওয়াই এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য।
তবে নতুন নিয়মের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো গুগল সার্চ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। গুগলের বক্তব্য অনুযায়ী, সার্চ এবং এআই প্রযুক্তি এখন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে কোনো স্কুল যদি শিক্ষার্থীদের জন্য এআই সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তাদের গুগল সার্চ ব্যবহারের সুযোগও থাকবে না।
এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার স্কুলের থাকা উচিত। কিন্তু এ কারণে সাধারণ তথ্য খোঁজার সুযোগও বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষার জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি গুগলের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, গুগল নিজেদের বাজারে শক্তিশালী অবস্থান ব্যবহার করে সরকারি স্কুলগুলোকে এআই ব্যবহারের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। তাঁর মতে, স্কুলগুলো কীভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা পরিচালনা করবে, সেই সিদ্ধান্ত কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের চাপের কারণে হওয়া উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফেডারেল বাণিজ্য কমিশনের প্রধান লিনা খানও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার অন্যতম প্রধান মাধ্যম গুগল। প্রতিষ্ঠানটি যদি এআই ব্যবহারের সঙ্গে সার্চ সুবিধাকে যুক্ত করে দেয়, তাহলে স্কুলগুলোর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।
অন্যদিকে, শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ফেয়ারপ্লের প্রধান জশ গোলিনও গুগলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, স্কুলগুলো যদি মনে করে শিশুদের জন্য এআই ব্যবহার নিরাপদ নয়, তাহলে তাদের সেই সুবিধা বন্ধ রাখার স্বাধীনতা থাকা উচিত।
এই বিতর্কের পেছনে রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই ব্যবহারের দ্রুত বিস্তার। অনেক শিক্ষার্থী এখন বাড়ির কাজ, রচনা তৈরি এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এআই ব্যবহার করছে। এতে পড়াশোনা সহজ হলেও শিক্ষার্থীরা নিজেরা চিন্তা করে উত্তর বের করার অভ্যাস হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা। এ ছাড়া এআই ব্যবহার করে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগও বাড়ছে।
এ কারণে নিউইয়র্ক শহর এবং লস অ্যাঞ্জেলেসের স্কুলগুলোতে ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য এআই ব্যবহারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, পড়াশোনার মান এবং প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে নতুন করে নিয়ম তৈরির চেষ্টা করছে। গুগল জানিয়েছে, নতুন নিয়ম আগামী ২০২৭ সালের শুরু থেকে ধাপে ধাপে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে স্কুলগুলোকে নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হবে।
গুগলের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার দাবি রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ তথ্য খোঁজার সুযোগ চালু রাখার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। এখন স্কুলগুলো কী সিদ্ধান্ত নেয় এবং গুগল সার্চ ও এআই ব্যবহারের মধ্যে আলাদা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।