যুক্তরাষ্ট্রে আটক আফগানদের দেশে ফেরত পাঠানো আপাতত বন্ধ করল আদালত
যুক্তরাষ্ট্রে আটক আফগান নাগরিকদের পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা সাময়িকভাবে বন্ধ করেছেন আদালত। আগামী ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকবে এই আদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রে আটক আফগান নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা সাময়িকভাবে আটকে দিয়েছেন দেশটির একটি ফেডারেল আদালত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন মানবাধিকার সংগঠন, সাবেক মার্কিন সেনাসদস্য এবং কংগ্রেসের একাধিক সদস্য। তাঁদের আশঙ্কা, আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হলে এসব নাগরিকের জীবন বিপদের মুখে পড়তে পারে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতের বিচারক ভ্যালেরি ক্যাপ্রোনি এই নির্দেশ দেন। আদেশ অনুযায়ী, আগামী শনিবার (৭ নভেম্বর) পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আটক আফগান নাগরিকদের আফগানিস্তান অথবা পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো যাবে না।
আদালতে শুনানির সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আইনজীবীরা জানান, চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত আফগান নাগরিকদের আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে পাঠানোর জন্য কোনো বিশেষ কিংবা বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের যাত্রা নির্ধারিত বা নিশ্চিত করা হয়নি। এই বক্তব্যের ভিত্তিতে বিচারক সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। আদালতের আদেশে সরকারকে নিজেদের দেওয়া বক্তব্য মেনে চলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে আটক প্রায় ২০০ আফগান নাগরিককে পাকিস্তানের মাধ্যমে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্য থেকে বিশেষ উড়োজাহাজে তাঁদের প্রথমে পাকিস্তানে নেওয়া হতো। পরে সেখান থেকে স্থলপথে আফগানিস্তানে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবান সরকারের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় সরাসরি আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে জটিলতা রয়েছে। এ কারণে পাকিস্তানকে মধ্যবর্তী দেশ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, পাকিস্তানে পাঠানোর পর এসব আফগান নাগরিককে তালেবান কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা অতীতে মার্কিন সেনাবাহিনী, সরকারি সংস্থা কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁদের জন্য দেশে ফিরে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান আবার ক্ষমতায় আসার পর অনেক মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। তাঁদের মধ্যে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কাজ করা আফগান নাগরিক এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া হতে পারে বলে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
আটক আফগানদের ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ৬৬ জন সদস্যও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কওয়েইন মুলিনকে চিঠি দিয়ে এই পরিকল্পনা বন্ধ করার আহ্বান জানান।
চিঠিতে বলা হয়, ঝুঁকির মধ্যে থাকা এসব মানুষকে ফেরত পাঠানো হলে তাঁরা নির্যাতন, নিপীড়ন এমনকি মৃত্যুর মুখেও পড়তে পারেন। বিশেষ করে সাবেক মার্কিন সহযোগীদের পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা।
আফগানদের সহায়তায় কাজ করা সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ৮০ জনের বেশি আটক আফগান নাগরিক সম্ভাব্য ফেরত পাঠানোর নোটিশ পেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য রয়েছেন বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
এদিকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আফগান নাগরিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার দাবি জানিয়েছে।
তবে আদালতের এই আদেশ স্থায়ীভাবে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা বাতিল করেনি। এটি কেবল সাময়িক নিষেধাজ্ঞা। আগামী ৭ নভেম্বরের পর পরিস্থিতি কী হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আটক আফগান নাগরিকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের দিকে এখন নজর রাখছেন মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।