১০ লাখ রোহিঙ্গার অপেক্ষা, ১৯ নভেম্বর মিয়ানমার নিয়ে সিদ্ধান্ত দেবে আন্তর্জাতিক আদালত
রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, বাস্তুচ্যুতি ও গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে প্রায় সাত বছরের আইনি প্রক্রিয়া শেষে গুরুত্বপূর্ণ রায়ের অপেক্ষায় বিশ্ব। ১৯ নভেম্বরের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা লাখো রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ৩ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে রায়ের তারিখ ঘোষণা করে। আদালতের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ১৯ নভেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় (দ্য হেগের স্থানীয় সময়) প্রকাশ্য অধিবেশনে রায় দেওয়া হবে। মামলাটি পরিচিত ‘দ্য গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ নামে। জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর রয়েছে।
মামলাটির সূত্রপাত ২০১৭ সালের আগস্টে। ওই সময় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পর ব্যাপক সহিংসতা শুরু হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও অন্যান্য গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। তাঁদের অনেকে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে ঠাঁই নেন।
২০১৯ সালের নভেম্বরে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। দেশটির অভিযোগ, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান ১৯৪৮ সালের গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের লঙ্ঘন। গাম্বিয়া আদালতের কাছে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় দায় নির্ধারণ এবং গণহত্যা সনদের অধীনে দেশটির দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চেয়েছে।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই জরুরি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিল। এর আওতায় মিয়ানমারকে গণহত্যা সনদের আওতাভুক্ত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে, সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সংরক্ষণ করতে এবং আদালতে নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। তবে ওই অন্তর্বর্তীকালীন আদেশকে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার চূড়ান্ত বিচারিক ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি মামলার মূল বিচারিক শুনানি শুরু হয়। এ পর্যায়ে গাম্বিয়া ও মিয়ানমার নিজেদের যুক্তি, বক্তব্য এবং প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করে। মামলায় ১১টি রাষ্ট্রও হস্তক্ষেপকারী হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ফলে এটি শুধু দুই দেশের মধ্যকার বিরোধ নয়, বরং গণহত্যা সনদের আন্তর্জাতিক প্রয়োগ ও রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে।
রায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের পেছনে একটি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল কি না। আন্তর্জাতিক আইনে শুধু ব্যাপক হত্যা, নির্যাতন কিংবা বাস্তুচ্যুতির প্রমাণ থাকলেই গণহত্যা প্রতিষ্ঠিত হয় না। গণহত্যার আইনি সংজ্ঞা পূরণে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার বিশেষ উদ্দেশ্যও প্রমাণ করতে হয়।
অন্যদিকে মিয়ানমার গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির পক্ষ থেকে ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফলে আদালতের সামনে অভিযোগকারী পক্ষের উপস্থাপিত প্রমাণ এবং মিয়ানমারের আত্মপক্ষ সমর্থনের যুক্তি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ৩ নভেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই রায় রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচারের দাবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে পারে। সংস্থাটি বলেছে, আদালতের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে এবং এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ নেই। তবে রায় যে পক্ষের বিরুদ্ধেই যাক, তার বাস্তবায়ন এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের জন্য এই মামলার গুরুত্ব অনেক গভীর। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ শিশু ও তরুণ। দীর্ঘদিন ধরে শিবিরে বসবাসের কারণে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁদের নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় মিয়ানমারের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনাকে প্রভাবিত করতে পারে।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।