সৌদি আরবে সংকট বাড়লে বড় ধাক্কায় পড়বে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ও অর্থনীতি।
সৌদি আরবের সংকট দীর্ঘায়িত হলে নতুন কর্মসংস্থান, প্রবাসী আয়, জ্বালানি আমদানি ও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি হতে পারে বড় ধরনের চাপ।
সৌদি আরবের চলমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার আয়, জ্বালানি আমদানি, সার সরবরাহ এবং রপ্তানি বাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হিসেবে সৌদি আরবের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেশি হওয়ায় দেশটির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
৩০ অক্টোবর প্রকাশিত পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশকে কয়েকটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হতে পারে। বিশেষ করে নতুন কর্মী নিয়োগ কমে যাওয়া এবং ভবিষ্যতে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শ্রমবাজার। দেশটির বিভিন্ন নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, পরিবহন, পরিচ্ছন্নতা, সেবা ও অন্যান্য খাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশির সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দেশটির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন সরাসরি বাংলাদেশের লাখ লাখ পরিবারকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মোট ৫ লাখ ৯০ হাজার ১৮৮ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৭৩৫। অর্থাৎ বিদেশে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ।
এই পতনের পেছনে সৌদি আরবের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চলতি বছরের ওই সময়ে সৌদি আরবে গেছেন ৩ লাখ ১৫ হাজার ৯৩৫ জন বাংলাদেশি। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৭৭ হাজার ১০ জন। অর্থাৎ সৌদি আরবে কর্মী যাওয়ার হার কমেছে প্রায় ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ।
বিমান চলাচলে বিঘ্ন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ঢাকা থেকে সৌদিগামী সরাসরি ও সংযোগকারী ফ্লাইটের সূচি ব্যাহত হয়েছে। ১০ থেকে ২৩ অক্টোবরের মধ্যে ১৪১টি ফ্লাইটে বিঘ্ন ঘটেছে এবং প্রায় ২১ হাজার ৯৩৩ জন যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্যের বরাতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
এদের মধ্যে অনেকেই নতুন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কেউ কেউ চাকরির ব্যবস্থা, ভিসা, বিমানভাড়া এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের জন্য ইতিমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেছেন। ফ্লাইট বাতিল বা দীর্ঘ বিলম্বের কারণে তাঁদের কর্মস্থলে যোগ দেওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সময়মতো কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরির সুযোগ হারানো কিংবা অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে সৌদি আরবের সংকট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশে প্রবাসী আয় কমে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন কর্মীরা বিদেশে যাওয়ার পর নিয়মিত আয় শুরু করে দেশে অর্থ পাঠাতে সাধারণত কিছুটা সময় নেন। ফলে বর্তমানে সৌদি আরব থেকে যে অর্থ আসছে, তা মূলত আগে থেকে কর্মরত প্রবাসীদের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল প্রায় ১২৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ এই সময়ে সৌদি আরব থেকে প্রবাসী আয় বেড়েছে। দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ১৯ দশমিক ২ শতাংশ এসেছে এই একটি দেশ থেকে। একই সময়ে সব দেশ মিলিয়ে বাংলাদেশ পেয়েছে প্রায় ৮৫৯ কোটি ডলার।
এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরছে। বর্তমানে প্রবাসী আয় বাড়লেও নতুন কর্মী পাঠানোর সংখ্যা কমে গেলে ভবিষ্যতে সেই আয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। সৌদি আরবে কর্মসংস্থান কমে গেলে কিংবা কর্মরত শ্রমিকদের আয় কমে গেলে তাঁদের পরিবারের কাছে পাঠানো অর্থও কমে যেতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ, গ্রামীণ অর্থনীতি, পারিবারিক ব্যয় এবং দেশের আমদানি সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
জ্বালানি খাতেও বাংলাদেশের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। বণিক বার্তার ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টন আরব লাইট অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করে। এসব তেল চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, বিটুমিনসহ বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য উৎপাদন করা হয়।
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেল উৎপাদন, রপ্তানি টার্মিনাল কিংবা সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যাহত হলে বাংলাদেশকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হতে পারে। এতে আমদানি ব্যয়, জাহাজভাড়া, বিমা খরচ এবং সরবরাহের সময় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশের জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ডলার ব্যয় করতে হবে। এর প্রভাব পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও শিল্প খাতেও পড়তে পারে।
সারের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া ও ডিএপি সার আমদানি করে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে ৫ লাখ ২০ হাজার টন ইউরিয়া আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ২০ হাজার টনের ক্রয় নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরব থেকে ডিএপি সার আনার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, তখন পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে সার সরবরাহ বন্ধ হওয়ার কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সরবরাহকারীদের পক্ষ থেকেও চুক্তিবদ্ধ চালান নিয়ে তাৎক্ষণিক অনিশ্চয়তার কথা জানানো হয়নি। অর্থাৎ সার আমদানি ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে—এমন দাবি সঠিক নয়। বরং সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে ভবিষ্যতে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যও এই পরিস্থিতির বাইরে নয়। সৌদি আরব বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য পণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪০ কোটি ডলার বলে সৌদি-বাংলাদেশ বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট সংগঠনের বরাতে বণিক বার্তা জানিয়েছে।
আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং হরমুজ প্রণালির নৌপথে ঝুঁকি বাড়লে পণ্য পরিবহনে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হতে পারে। এতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়বে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়লে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের চাহিদাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। ফলে ওই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে একসঙ্গে কর্মসংস্থান, প্রবাসী আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় জাপান, পূর্ব ইউরোপ এবং শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে এমন অন্যান্য দেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি বিদেশগামী কর্মীদের নিরাপত্তা, ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি, আটকে পড়া যাত্রীদের সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
সৌদি আরবের চলমান সংকট বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে সব অর্থনৈতিক খাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, এমন প্রমাণ নেই। তবে কর্মী নিয়োগে ইতিমধ্যে যে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। জ্বালানি ও সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আমদানি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। তাই পরিস্থিতির নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, বিকল্প জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা এবং নতুন শ্রমবাজার তৈরির মাধ্যমে এখনই প্রস্তুতি নেওয়া বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।