ইসরায়েল নির্বাচনে এগিয়ে নেতানিয়াহু, তবু ক্ষমতায় ফেরা নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট ৫৩ আসন পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি; সরকার গঠনে বিরোধী ও আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।
ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত আসন বণ্টন প্রকাশিত হয়েছে। তবে নির্বাচনের ফলাফল দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সর্বাধিক আসন পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী শিবিরও এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি। ফলে নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
৩০ অক্টোবর শুক্রবার ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত আসন বণ্টন প্রকাশ করে। ১২০ সদস্যের সংসদে সরকার গঠনের জন্য কমপক্ষে ৬১টি আসন প্রয়োজন। প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক দল সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন।
ফলে কোনো পক্ষই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা এবং জোট গঠনের আলোচনাই এখন ইসরায়েলের রাজনীতির প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
দলভিত্তিক ফলাফলে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৭টি আসন পেয়ে সংসদের বৃহত্তম একক দল হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২১টি আসন। নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন বেয়াখাদ পার্টি পেয়েছে ১২টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন যৌথ তালিকা পেয়েছে ১১টি আসন।
এ ছাড়া গণতন্ত্রী দল পেয়েছে ৮টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম পার্টিও পেয়েছে ৮টি আসন। ইসরায়েল বেইতেনু, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম এবং ওতজমা ইয়েহুদিত প্রত্যেকেই পেয়েছে ৭টি করে আসন। শাস এবং ধর্মীয় ইহুদিবাদী দল পেয়েছে ৬টি করে আসন।
এই ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে, লিকুদ পার্টি এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও পুরো রাজনৈতিক জোটের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। নেতানিয়াহুর জোটকে সরকার গঠন করতে হলে আরও অন্তত আটটি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের প্রয়োজন আরও ১৩টি আসন।
বিশেষ করে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্মিলিত ১৯টি আসন এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছে। সংসদে তাদের সমর্থন ছাড়া বিরোধী জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হতে পারে। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সমঝোতা নিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে আসনসংখ্যার হিসাব থাকলেও রাজনৈতিক সমঝোতা কতটা সম্ভব হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
নির্বাচনের পর বিরোধী শিবিরের নেতারা সরকার গঠনের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। আইজেনকোট এবং নাফতালি বেনেটের মধ্যে বৈঠকের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তাদের আলোচনার লক্ষ্য দ্রুত একটি নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা খুঁজে বের করা। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আদর্শিক অবস্থান, নিরাপত্তা নীতি এবং আরব দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে মতপার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের অবস্থান জানিয়েছেন। আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিরোধিতাও করেছেন তিনি। ফলে তাঁর সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিদ্যমান জোটের বাইরে থেকে প্রয়োজনীয় সংসদ সদস্যদের সমর্থন সংগ্রহ করা।
এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ১৯৯৯ সালের পর এটিই দেশটির সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি বলে জানিয়েছে নির্বাচনসংক্রান্ত প্রতিবেদন। নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভোটারদের আগ্রহের বিষয়টি সামনে এনেছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, পরবর্তী যুদ্ধ এবং সরকারের ভূমিকা এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। বিশেষ করে ওই হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে তদন্তের দাবি নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে। বিরোধী পক্ষের বিভিন্ন নেতা ওই ঘটনার বিষয়ে তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর অবস্থান এবং তাঁর সরকারের নিরাপত্তা নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
এ ছাড়া দেশটির অতি-ধর্মীয় ইহুদি জনগোষ্ঠীর সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের বিষয়টিও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই জনগোষ্ঠীর সামরিক সেবায় ছাড় দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে বিতর্ক চলছে। এক পক্ষ এই ছাড়ের অবসান চাইলেও অন্য পক্ষ ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরে বিদ্যমান ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আরেকটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচনে অনিয়ম এবং বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বিদেশি হস্তক্ষেপসংক্রান্ত কিছু অভিযোগ তদন্তের জন্য দেশটির নিরাপত্তা সংস্থার কাছে পাঠানোর খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এই তদন্তের কারণে প্রকাশিত আসন বণ্টন পরিবর্তিত হয়েছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য কোনো একটি দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন বাধ্যতামূলক নয়। বিভিন্ন দল পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে জোট গঠন করে সরকার পরিচালনা করতে পারে। তবে সেই জোটের সংসদে কমপক্ষে ৬১ সদস্যের সমর্থন থাকা প্রয়োজন। এ কারণে এবারের নির্বাচনে ছোট দলগুলোর পাশাপাশি আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশন আসন বণ্টনের চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়ার আগে ত্রুটি ও আপত্তি পর্যালোচনার প্রক্রিয়া রয়েছে। আগামী ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক ফলাফল রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজগের কাছে জমা দেওয়ার কথা। নতুন সংসদের শপথ গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ নভেম্বর।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। নেতানিয়াহুর দল বৃহত্তম একক দল হিসেবে অবস্থান ধরে রাখলেও সরকার গঠনের জন্য তাঁকে জোটের সমর্থন বাড়াতে হবে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের সামনে রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা তৈরির চ্যালেঞ্জ। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ১৯টি আসন এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের আলোচনা ও দলগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।






মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।