চ্যাটজিপির পরামর্শে মৃগীরোগের ওষুধ কমিয়ে মৃত্যুর অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে ৩১ বছর বয়সী বোয়েন ওয়ানের পরিবার ওপেনএআই ও স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে ৩১ বছর বয়সী বোয়েন ওয়ানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। মৃগীরোগ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ সেবন করতেন তিনি। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কথোপকথনের মাধ্যম চ্যাটজিপিটির পরামর্শ অনুসরণ করে তিনি ধীরে ধীরে সেই ওষুধের মাত্রা কমিয়ে একপর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। এর কিছুদিন পরই তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাঁর বাবা-মা যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ২৭ অক্টোবর ২০২৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো কাউন্টির উচ্চ আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। বোয়েনের বাবা কুন ওয়ান ও মা মেইছিন শু তাঁদের মেয়ের মৃত্যুর জন্য চ্যাটজিপিটির বিপজ্জনক চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ এবং ওপেনএআইয়ের পণ্য নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, চ্যাটজিপিটি শুধু ওষুধ কমানোর পরিকল্পনাই তৈরি করেনি, বরং চিকিৎসকদের কাছ থেকে বিষয়টি গোপন রাখতেও তাঁকে উৎসাহিত করেছিল। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। বোয়েন ওয়ান ছিলেন চীনের জিয়াংসু প্রদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা একজন মেধাবী তরুণী। তিনি অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করেন এবং পরবর্তী সময়ে অ্যামাজনে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে বসবাস করতেন তিনি। মাত্র ৩১ বছর বয়সে তাঁর জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি এখন প্রযুক্তি ও চিকিৎসা নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। বোয়েন দীর্ঘদিন ধরে মৃগীরোগে ভুগছিলেন। এই রোগে মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের কারণে বারবার খিঁচুনি হতে পারে। তাঁর চিকিৎসায় চিকিৎসকেরা ল্যামোট্রিজিন নামের একটি ওষুধ ব্যবহার করছিলেন। ওষুধটি তাঁর খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল। প্রতিদিন ৪০০ মিলিগ্রাম ওষুধ গ্রহণ করতেন তিনি। তবে ওষুধটির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল। বিশেষ করে কথা বলার সময় প্রয়োজনীয় শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা হওয়া এবং চিন্তাভাবনার গতি কমে যাওয়ার বিষয়টি তাঁকে চিন্তিত করেছিল।
২০২১ সাল থেকেই অসুস্থতার কারণে তাঁর কর্মজীবন ব্যাহত হচ্ছিল। মৃগীরোগের কারণে নিয়মিত কাজের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ায় তিনি অ্যামাজন থেকে চিকিৎসাজনিত ছুটিতে ছিলেন। তাঁর চিকিৎসকেরা বিভিন্ন ওষুধ পরিবর্তন করে দেখেছেন। এমনকি মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের বিষয়টিও বিবেচনায় এসেছিল। কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাভাবনার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ থাকায় তিনি সে বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না। ২০২৩ সালে বোয়েন নিয়মিত চ্যাটজিপিটি ব্যবহার শুরু করেন। প্রথম দিকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বাস্থ্যবিমা এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তথ্য জানতে তিনি এই মাধ্যম ব্যবহার করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতি তাঁর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কোনো কোনো সপ্তাহে তিনি চ্যাটজিপিটির সঙ্গে দেড় হাজারের বেশি বার্তা আদান-প্রদান করতেন। দীর্ঘ সময় ধরে কথোপকথনও চলত। ধীরে ধীরে নিজের ব্যক্তিগত ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও তিনি এই মাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অ্যামাজন থেকে চাকরি হারানোর খবর পান বোয়েন। এই ঘটনা তাঁর জীবনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করে। চাকরি হারানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার অনুমতি এবং স্থায়ী বসবাসের আবেদন নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। নতুন চাকরির সাক্ষাৎকারে ভালোভাবে কথা বলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা ছিল। তাঁর ধারণা হয়েছিল, মৃগীরোগের ওষুধের কারণে ইংরেজিতে কথা বলার দক্ষতা ও চিন্তাভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই উদ্বেগ থেকেই তিনি চ্যাটজিপিটির কাছে ওষুধ কমানোর বিষয়ে পরামর্শ চান বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চ্যাটজিপিটির জিপিটি-৪ও সংস্করণ তাঁর দৈনিক ৪০০ মিলিগ্রাম ল্যামোট্রিজিনের মাত্রা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শূন্যে নামিয়ে আনার একটি দিনভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করে। প্রায় ২৫ দিনের মধ্যে ওষুধ পুরোপুরি বন্ধ করার পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এখানেই ঘটনাটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। বোয়েন যখন চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন, তখন চ্যাটজিপিটি চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তকে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল বলে অভিযোগ। শুধু তা-ই নয়, চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়াই নিজের মতো করে ওষুধের মাত্রা পরিবর্তনের বিষয়েও তাঁকে উৎসাহিত করা হয়েছিল বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। বোয়েনের চিকিৎসক নিকোলাস পুলস তাঁকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের মৃগীরোগ বিভাগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মামলার তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসক বোয়েনকে একটি রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে ওষুধের মাত্রা কতটুকু রয়েছে, তা বোঝা সম্ভব হতো। কিন্তু অভিযোগ, বোয়েন যখন পরীক্ষাটি না করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন চ্যাটজিপিটি তাঁর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিল। এমনকি চিকিৎসকের কাছে ওষুধ কমানোর পরিকল্পনার কথা না বলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, এই সময় বোয়েনের শারীরিক অবস্থারও পরিবর্তন হচ্ছিল। তিনি বিভ্রান্তির কথা বলছিলেন, সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলছিলেন এবং আগের খিঁচুনির মতো অস্বাভাবিক অনুভূতির কথা জানাচ্ছিলেন। কখনো কখনো নিজের কথা ঠিকমতো বুঝতে না পারা এবং অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব লক্ষণের পরও চ্যাটজিপিটি তাঁকে আশ্বস্ত করেছিল বলে অভিযোগ। তাঁর মস্তিষ্ক নতুন ওষুধের মাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে, এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। নিউইয়র্ক টাইমস বোয়েনের সঙ্গে চ্যাটজিপিটির দীর্ঘ কথোপকথন পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, ওষুধ কমানো নিয়ে তিনি অন্তত ১৫৮ বার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এসব উদ্বেগের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। মামলার নথিতে আরও বলা হয়েছে, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাতে বোয়েন চ্যাটজিপিটিকে মাথাব্যথা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। রাত ৮টা ১ মিনিটে পাঠানো তাঁর শেষ বার্তায় মাথার ব্যথা জ্বরের সময়কার ব্যথার মতো কি না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি তাঁকে জানিয়েছিল, এই ব্যথা বিপজ্জনক নয় এবং সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। এমনকি মস্তিষ্ক নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে বলেও তাঁকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। এর পরদিন, অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নাগাদ বোয়েনের মৃত্যু হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাঁকে ১৪ ফেব্রুয়ারি সিয়াটলের বাসায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যরা চীনে অবস্থান করছিলেন। মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়ায় তাঁরা পরিচিত ব্যক্তিদের বাসায় খোঁজ নিতে পাঠান। পরে ভিডিও যোগাযোগের মাধ্যমে মেয়ের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন তাঁরা। ময়নাতদন্তের তথ্য এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিং কাউন্টির চিকিৎসা পরীক্ষকের তথ্য অনুযায়ী, বোয়েনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে মৃগীরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আকস্মিক অপ্রত্যাশিত মৃত্যু উল্লেখ করা হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে এসইউডিইপি বলা হয়। অর্থাৎ মৃগীরোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির এমন আকস্মিক মৃত্যু, যার সুনির্দিষ্ট কারণ সব সময় পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয় না।
ময়নাতদন্তে তাঁর রক্তে ল্যামোট্রিজিনের মাত্রা পাওয়া যায় প্রতি মিলিলিটারে শূন্য দশমিক ৬৪ মাইক্রোগ্রাম। মামলার তথ্য অনুযায়ী, এটি ওষুধটির সাধারণ চিকিৎসাগত গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিম্নসীমার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ। পরিবারের আইনজীবীরা এই তথ্যকে ওষুধের মাত্রা কমানোর সঙ্গে মৃত্যুর সম্ভাব্য সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে শুধু রক্তে ওষুধের মাত্রা কম পাওয়া গেলেই মৃত্যুর সঙ্গে চ্যাটজিপিটির পরামর্শের সরাসরি কারণগত সম্পর্ক আদালতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। বিষয়টি বিচারিক ও চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে। বোয়েনের বাবা-মায়ের অভিযোগ, তাঁদের মেয়ে যখন চিকিৎসকদের পরিবর্তে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে শুরু করেন, তখন সেই ব্যবস্থার উচিত ছিল তাঁকে চিকিৎসকের কাছে ফিরে যেতে বলা। বিশেষ করে মৃগীরোগের মতো জটিল রোগে নিয়মিত ওষুধের মাত্রা পরিবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাঁদের দাবি, চ্যাটজিপিটি যদি শুরুতেই ওষুধ বন্ধ করার পরিকল্পনা দিতে অস্বীকৃতি জানাত এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর জোর দিত, তাহলে হয়তো তাঁদের মেয়ের মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো। পরিবারের আইনজীবীরা মামলায় ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে অবহেলা, পণ্যের নকশাগত ত্রুটি, প্রয়োজনীয় সতর্কতা দিতে ব্যর্থতা এবং লাইসেন্স ছাড়া চিকিৎসাসেবা দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। তাঁদের বক্তব্য, একটি প্রযুক্তিপণ্য যখন মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন সেটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার দায়িত্বও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁরা ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপজ্জনক চিকিৎসা পরামর্শ ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ওপেনএআই এই ঘটনাকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি চ্যাটজিপিটির আগের একটি সংস্করণকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। বোয়েন যে জিপিটি-৪ও সংস্করণ ব্যবহার করতেন, সেটি ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ বোয়েনের মৃত্যুর পরদিনই সংস্করণটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, চিকিৎসক ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে সংবেদনশীল এবং জরুরি পরিস্থিতিতে চ্যাটজিপিটির প্রতিক্রিয়া উন্নত করার চেষ্টা চলছে। নতুন সংস্করণগুলোতে ব্যবহারকারীর জরুরি স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে বলেও প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য। একই সঙ্গে ওপেনএআই জানিয়েছে, চ্যাটজিপিটি চিকিৎসকের বিকল্প নয়। এই ঘটনা প্রযুক্তি ব্যবহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। বর্তমানে অনেকেই চিকিৎসা, ব্যক্তিগত সমস্যা, মানসিক চাপ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিচ্ছেন। সহজ ভাষায় দ্রুত উত্তর পাওয়ার কারণে অনেক ব্যবহারকারী এসব ব্যবস্থাকে নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতা হিসেবে বিবেচনা করছেন। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সব সময় সঠিক তথ্য দিতে পারে না। কখনো ভুল তথ্যকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে। আবার ব্যবহারকারীর দেওয়া অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে এমন পরামর্শও দিতে পারে, যা বাস্তব পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে মৃগীরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় নিয়মিত ওষুধ সেবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগী ভালো অনুভব করছেন কিংবা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে—এমন কারণেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা নিরাপদ নয়। ল্যামোট্রিজিনের মতো খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করলে খিঁচুনির ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। ওষুধের মাত্রা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে রোগীর শারীরিক অবস্থা, আগের চিকিৎসার ইতিহাস এবং অন্যান্য ওষুধের বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
চিকিৎসকদের মতে, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে সমস্যা হলে রোগীর উচিত বিষয়টি সরাসরি চিকিৎসককে জানানো। প্রয়োজনে চিকিৎসক ওষুধ পরিবর্তন, মাত্রা সমন্বয় কিংবা বিকল্প চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন। কিন্তু নিজে নিজে কিংবা কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নির্দেশনা অনুসরণ করে ওষুধ কমানো বা বন্ধ করা উচিত নয়। বোয়েন ওয়ানের মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতির বিষয় নয়; এটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের সীমা নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে একটি প্রযুক্তিব্যবস্থা যখন ব্যবহারকারীর সঙ্গে দীর্ঘদিন কথোপকথনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে, তখন ভুল পরামর্শের সম্ভাব্য ক্ষতি আরও বড় হতে পারে। তবে এই মামলার চূড়ান্ত ফল এখনো আসেনি। ওপেনএআই কিংবা স্যাম অল্টম্যানকে আদালত এখনো দায়ী ঘোষণা করেননি। পরিবারের অভিযোগ, কথোপকথনের নথি, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত পর্যালোচনার পরই আদালত প্রকৃত দায় ও ক্ষতির বিষয়টি নির্ধারণ করবেন। ফলে এই মুহূর্তে ঘটনাটিকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুতর অভিযোগ ও বিচারাধীন মামলা হিসেবে বিবেচনা করাই যথাযথ।
মন্তব্য ০
লগইন করুন অথবা বিনা মূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন আলোচনায় যোগ দিতে। নাম গোপন রেখেও মন্তব্য করতে পারবেন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।