সরাসরি মানচিত্র, পূর্বাভাস ও জরিপের গড়: PoliAgg (CC BY-SA 4.0)

পূর্ণ ফলাফল, মানচিত্র ও জরিপ
ব্রেকিং
‘আমেরিকান নাগরিক হতে গর্বিত’—ডব্লিউএনবিএর জাতীয় সংগীত বিতর্কে মুখ খুললেন সোফি কানিংহামনয় মাসেই ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা লোকসান, অর্ধেকে নামল ইসলামী ব্যাংকের নিট সম্পদমূল্যসৌদি আরবে সংকট বাড়লে বড় ধাক্কায় পড়বে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ও অর্থনীতি।ইসরায়েল নির্বাচনে এগিয়ে নেতানিয়াহু, তবু ক্ষমতায় ফেরা নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তাকাতারের সরবরাহে অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল গ্যাস কেনার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

কাতারের সরবরাহে অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল গ্যাস কেনার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

কাতার থেকে সরবরাহে অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির আলোচনা জোরদার করছে বাংলাদেশ; চূড়ান্ত চুক্তির অপেক্ষায় ঢাকা, জ্বালানি নিরাপত্তায়।

কাতারের সরবরাহে অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল গ্যাস কেনার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ
কাতারের সরবরাহে অনিশ্চয়তা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল গ্যাস কেনার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ, কাতার থেকে গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকছে ঢাকা। নতুন কয়েকটি গ্যাস ক্রয় প্রস্তাব ইতিমধ্যে বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে। এসব প্রস্তাবের বিষয়ে শিগগিরই একাধিক চুক্তি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন।

৩০ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রির সম্ভাবনা বাড়ছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে কয়েকটি গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব বিভিন্ন অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। তাঁর প্রত্যাশা, অদূর ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি ক্রয়চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।

ঢাকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মতো বন্ধুপ্রতিম ও অংশীদার দেশগুলোর জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানির উৎস নিশ্চিত করতে চায়। তিনি আরও জানান, প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানির বিষয়েও ভবিষ্যতে চুক্তি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব বেড়েছে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে। দীর্ঘদিন ধরে কাতার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী দেশ। কিন্তু যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কাতার থেকে নির্ধারিত সময়ে গ্যাসবাহী জাহাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদন এবং আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাসের চাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ফলে সরকারকে বিকল্প দেশ থেকে গ্যাস সংগ্রহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকেও অতিরিক্ত জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।

২৭ অক্টোবর প্রকাশিত বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কিছু ক্রেতাকে চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত সরবরাহসংক্রান্ত বিশেষ পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ কাতার থেকে নির্ধারিত গ্যাস সরবরাহে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থাকতে পারে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত খোলাবাজারের চালান সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তবে এ ধরনের কেনাকাটায় ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় আমদানি ব্যয় এবং আর্থিক চাপ বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছর বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তাঁর ধারণা, দীর্ঘমেয়াদে ২০৫০ সাল নাগাদ এই বাজারের আকার ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এই ১০ বিলিয়ন ডলারের পরিমাণকে বাংলাদেশের সরকারের নিশ্চিত আমদানি ব্যয় বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির মূল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের সম্ভাব্য গ্যাসবাজার সম্পর্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দেওয়া একটি অনুমান। বাজারের প্রকৃত আকার নির্ভর করবে ভবিষ্যতের চাহিদা, আন্তর্জাতিক মূল্য, আমদানির পরিমাণ এবং সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের মে মাসে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকারি পর্যায়ের ক্রয়প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সেন্টালিয়ন গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহের চুক্তি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি আগে গানভোর নামে পরিচিত ছিল। এই চুক্তির আওতায় চলতি বছর থেকে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে নতুন করে আলোচনায় থাকা প্রস্তাবগুলো আগের চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত সরবরাহের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করা মার্কিন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান শেভরনও তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত। শেভরন বাংলাদেশে অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশপ্রধান শু সিয়ং জানিয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো গেলে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার ওপর নির্ভরশীলতাও কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের পেছনে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। অন্যদিকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদন বাড়ানোর কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার চাহিদা পূরণে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির প্রয়োজন বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই নির্ভরতা অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি করেছে।

এদিকে, ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার আরও ছয়টি গ্যাসবাহী জাহাজের চালান কেনার অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি চালান সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিপি প্রতিষ্ঠান থেকে এবং একটি কাতার এনার্জি ট্রেডিং থেকে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চললেও বাংলাদেশ একই সময়ে একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি আমদানির মূল্য নির্ধারণও বাংলাদেশের জন্য বড় বিবেচ্য বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে। সেই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব পড়ে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, সার উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সরকারকে ভর্তুকি বাড়াতে হতে পারে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ সীমিত করার প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে।

তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি গ্যাস কেনাই বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মূল্য নির্ধারণ, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহের নিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে মূল্য সমন্বয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একক কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়লেও ভবিষ্যতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে কাতারের সরবরাহ অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির কৌশলে পরিবর্তন আনছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন চুক্তি হলে সরবরাহের উৎস বাড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। তবে এসব প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন, চুক্তির মূল্য ও সরবরাহের পরিমাণ এখনো স্পষ্ট নয়। দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও অর্থনীতির স্বার্থে সরকার কতটা প্রতিযোগিতামূলক দামে এবং কতটা নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, সেটিই হবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।


ট্যাগ: বাংলাদেশযুক্তরাষ্ট্রজ্বালানি নিরাপত্তাতরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসগ্যাস আমদানিকাতারহরমুজ প্রণালিজ্বালানি সংকট

প্রতিবেদক

CSB News USA

মন্তব্য ০

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি করুন।

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সিএসবি নিউজ ইউএসএ ফলো করুন

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।