তিউনিসিয়ায় প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ, পদত্যাগের দাবি
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের দাবিতে তিউনিসিয়ায় রাস্তায় নেমেছেন হাজারো মানুষ। প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের শাসন নিয়ে বাড়ছে অসন্তোষ।
উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ায় প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। শনিবার, ১৭ অক্টোবর, রাজধানী তিউনিসের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জড়ো হয়ে তাঁরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার দাবি জানান। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে এটিকে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট সাঈদের শাসনামলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমেই একজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট ও জনসেবার অবনতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা সরকারের নীতির পরিবর্তন, রাজনৈতিক বিরোধীদের মুক্তি এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার দাবি তোলেন।
রাজধানীর ঐতিহাসিক হাবিব বুরগুইবা সড়কে বিক্ষোভকারীদের মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ২০১১ সালের গণআন্দোলনের সময়ও এই সড়ক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। ওই আন্দোলন তিউনিসিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক জাইন আল-আবিদিন বেন আলির পতনে ভূমিকা রাখে এবং পরবর্তীতে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণআন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। এবারের বিক্ষোভেও অংশগ্রহণকারীরা সেই সময়ের পরিচিত স্লোগান ব্যবহার করেন। তাঁদের বক্তব্যে গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি উঠে আসে।
এই বিক্ষোভে বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, বেকার মানুষ এবং বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি থাকলেও এবার বিভিন্ন পক্ষের মানুষের একসঙ্গে রাস্তায় নামাকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্টের সমালোচকদের মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিক সংগঠনের অধিকার রক্ষার দাবিও জানান। তাঁদের অনেকেই বেকারত্ব, দূষণ এবং দৈনন্দিন জীবনের সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তিউনিসিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনে ২০২১ সালের ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ওই বছর প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদ সংসদের কার্যক্রম স্থগিত করেন এবং সরকারকে বরখাস্ত করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সংসদ ভেঙে দেন, বিচার বিভাগের ওপর পরিবর্তন আনেন এবং ডিক্রির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা বাড়ান। তাঁর বিরোধীরা এসব পদক্ষেপকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সীমিত হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও দেশটিতে সাংবাদিক, বিরোধী রাজনীতিক এবং নাগরিক সমাজের সদস্যদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে আসছে। তবে প্রেসিডেন্ট সাঈদ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি স্বৈরশাসক নন; বরং দেশের স্বার্থ রক্ষা, দুর্নীতি মোকাবিলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছেন। অর্থনৈতিক সংকটের জন্য বিরোধীদের উসকানির অভিযোগও তিনি করেছেন। ফলে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটও সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। তিউনিসিয়ায় সরকারি পরিষেবার অবনতি, নিয়মিত পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন এবং ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব সমস্যার প্রভাব পড়ছে পরিবার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়। বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়েও মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্যে তাই শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি নয়, বরং মৌলিক পরিষেবা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা কাটিয়ে ওঠার দাবিও গুরুত্ব পেয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষ প্রেসিডেন্টের সমালোচকদের মুক্তি এবং শ্রমিক সংগঠনের অধিকারের সুরক্ষা দাবি করেছেন। তবে এই বিক্ষোভের পর সরকার কোনো বড় নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে কি না, কিংবা প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করবেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তিউনিসিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা ও দুর্নীতি মোকাবিলার কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে। হাজারো মানুষের এই বিক্ষোভ সরকারের ওপর জনমতের চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এর ফলে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কী পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়ার ওপর।





