সাত দিনের আলটিমেটাম দিয়ে উত্তরায় হাসপাতাল ও কলেজে তারেক রহমানের ঝটিকা সফর
ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও চিকিৎসাসেবার মান দেখতে উত্তরা হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী, পরে কলেজে পরিচ্ছন্নতা ও মশা প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর উত্তরায় কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল ও রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ডেঙ্গু পরিস্থিতি, চিকিৎসাসেবার মান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করাই ছিল এ সফরের মূল উদ্দেশ্য। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার সময় দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, সকাল ৯টা ১০ মিনিটে গুলশানের বাসভবন থেকে পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে বের হন তারেক রহমান। প্রথমে তিনি উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁরা যথাযথ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে খোঁজ নেন। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র এবং অস্ত্রোপচারকক্ষসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার পরিস্থিতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাসপাতালের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত রাখা যে অত্যন্ত জরুরি, পরিদর্শনের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, হাসপাতালের পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার উন্নয়নে কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোন কোন সূচকে উন্নয়ন পরিমাপ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত মূল্যায়ন পরিকল্পনা প্রকাশিত সংবাদে স্পষ্ট নয়। ফলে নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে, তা বোঝার জন্য পরবর্তী অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কেবল সৌন্দর্য বা শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি রোগীর নিরাপত্তা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যসেবার মানের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। হাসপাতালের মেঝে, শৌচাগার, চিকিৎসাকক্ষ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগীদের ব্যবহৃত স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি চিকিৎসা বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষ করে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সময়ে হাসপাতালগুলোর জন্য বাড়তি সতর্কতা জরুরি। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে কোথাও পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা জন্মানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ছাদ, নালা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র এবং অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি।
হাসপাতাল পরিদর্শনের পর প্রধানমন্ত্রী রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে যান। সেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের সদস্য এবং স্কাউট সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রতিরোধ। আর প্রতিরোধের জন্য নিজেদের বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। এ কাজে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চান তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বছরের এই সময়ে, বিশেষ করে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতিবছর ডেঙ্গুতে বহু মানুষ আক্রান্ত হন এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। এ পরিস্থিতিতে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার মতো প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা একটি ঘনবসতিপূর্ণ নগরী হওয়ায় শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মাধ্যমে সব জায়গা নিয়মিত পরিষ্কার রাখা কঠিন। তাই বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, সড়ক এবং পাড়া-মহল্লায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম মেনে চলা এবং জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করা সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় ও কলেজের প্রাঙ্গণ নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, ফুলের টব ও পানির পাত্র পরীক্ষা করা, পরিত্যক্ত বস্তু সরিয়ে ফেলা এবং সহপাঠীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করার মাধ্যমে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনকে পরিচ্ছন্নতার নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। কেবল এক দিনের অভিযান নয়, ধারাবাহিক কার্যক্রমই দীর্ঘমেয়াদে সুফল দিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং জনসেবার মান উন্নয়নের বিষয়টি সামনে এনেছে। তবে পরিদর্শনের তাৎপর্য নির্ভর করবে নির্দেশনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তার ওপর। হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান উন্নতি, রোগীদের অভিযোগের প্রতিকার এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের নিয়মিত তদারকি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
উত্তরায় হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং নাগরিক দায়িত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জন্য সাত দিনের সময়সীমা যেমন জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। এখন মূল বিষয় হলো, ঘোষিত নির্দেশনা কতটা বাস্তবায়িত হয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা টেকসই পরিবর্তন আনতে পারে।





