নির্বাচনের আগে উপদেষ্টাদের ওপর ক্ষুব্ধ ট্রাম্প, চাপে রিপাবলিকানদের ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রচারের খরচ, প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে উপদেষ্টাদের ওপর অসন্তুষ্ট ট্রাম্প। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় বাড়ছে রিপাবলিকানদের চাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নিজের রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী প্রচার পরিচালনাকারীদের নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রচারের বিপুল ব্যয়, নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের কৌশল এবং প্রার্থী বাছাইয়ের ফলাফল নিয়ে তাঁর প্রশ্নের মুখে পড়েছেন দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইয়ের মধ্যে এই অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের অসন্তোষের অন্যতম কারণ নির্বাচনী প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের অবস্থান প্রত্যাশা অনুযায়ী শক্তিশালী না হওয়া। প্রকাশ্য আর্থিক নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের সমর্থক গোষ্ঠী ম্যাগা ইনকরপোরেটেডের রাজনৈতিক সুপার প্যাক নির্বাচনী কার্যক্রমে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও জনমত জরিপে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না থাকায় এই অর্থ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশ্ন তুলেছেন। নির্বাচনের আগে আরও অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের অসন্তোষের কেন্দ্রে রয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগী জেমস ব্লেয়ার। তিনি ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রচার ও ম্যাগা ইনকরপোরেটেডের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। নির্বাচনী অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং প্রচারের কৌশল নিয়ে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তবে ওয়াইলসকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য রয়টার্সের প্রতিবেদনে নেই। ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী বিজয়ে ওয়াইলস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন এবং তাঁর সহযোগীরা হোয়াইট হাউসের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁকে কৃতিত্ব দিয়েছেন।
নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণও রিপাবলিকানদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে টেক্সাসে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা বাড়ানোর রাজনৈতিক সুবিধা পেতে রিপাবলিকানরা নতুন নির্বাচনী মানচিত্র তৈরি করেছে। এই কৌশলের উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনে দলটির আসন জয়ের সম্ভাবনা বাড়ানো। কিন্তু নতুন সীমানা নির্ধারণের ফলে প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেক্সাসে হিস্পানিক ভোটারদের সমর্থন আগের নির্বাচনের মতো ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্থনীতি পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু রিপাবলিকান নেতার আশঙ্কা, আসনের সীমানা পরিবর্তনের কৌশল উল্টো দলের কয়েকজন প্রার্থীর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই নির্বাচনের গুরুত্ব শুধু ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে, তার ওপর আগামী দুই বছরে সরকারের আইন প্রণয়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করবে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে গেলে তারা প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবে এবং সরকারের আইন প্রণয়নের পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টি করার সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষে নিজস্ব নীতিগত কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে জনমত জরিপ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নয়। নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে ভোটারদের উপস্থিতি, স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা এবং অর্থনীতি নিয়ে মানুষের মনোভাব ফলাফল বদলে দিতে পারে। তাই এখনই কোনো দলের জয় বা পরাজয় নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
ট্রাম্প নিজে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রার্থী নন, কিন্তু রিপাবলিকানদের ভোট বাড়াতে তিনি সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। সমর্থকদের কাছে তিনি নির্বাচনকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গেও যুক্ত করছেন। ফলে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ফলাফল তাঁর নেতৃত্ব, জনপ্রিয়তা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রভাবের মূল্যায়নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে দলটির নির্বাচনী কৌশল নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক শিবিরে অর্থ ব্যয়, প্রার্থী নির্বাচন ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে চাপ বাড়ছে। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে ভোটারদের সিদ্ধান্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর ফলাফলের ওপর। নির্বাচনের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিতই থাকবে।





