ব্রেকিং
মুসলিমদের ‘মোহাম্মদ’ নাম নিয়ে ট্রাম্পের কটাক্ষ, নতুন করে বিতর্করুশ তেল ইস্যুতে ভারতের ওপর শতভাগ শুল্কের হুমকি স্থগিত করলেন ট্রাম্প, স্বস্তিতে মোদি সরকারসাত দিনের আলটিমেটাম দিয়ে উত্তরায় হাসপাতাল ও কলেজে তারেক রহমানের ঝটিকা সফরইউক্রেনকে ঘিরে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান, ন্যাটোর সহায়তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগচীনের ১৩ ফুটের দৈত্যাকার রোবট, তুলতে পারে ৫০০ কেজি ভার, প্রযুক্তিবিশ্বে তোলপাড়!

হুতিদের ঠেকাতে এক হচ্ছে সৌদি আরব ও আমিরাত, ইয়েমেন যুদ্ধে নতুন মোড়

ইয়েমেনে হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় উদ্বিগ্ন উপসাগরীয় দেশগুলো। নতুন এক সমঝোতার খবর ঘিরে সৌদি আরব ও আমিরাতের সামরিক সহযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

হুতিদের ঠেকাতে এক হচ্ছে সৌদি আরব ও আমিরাত, ইয়েমেন যুদ্ধে নতুন মোড়
হুতিদের ঠেকাতে এক হচ্ছে সৌদি আরব ও আমিরাত, ইয়েমেন যুদ্ধে নতুন মোড়

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে আবারও কাছাকাছি আসছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইয়েমেনের কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, আমিরাত দক্ষিণ ইয়েমেনের সরকারপন্থী কয়েকটি সশস্ত্র বাহিনীকে আবার অর্থায়ন শুরু করতে সম্মত হয়েছে। বিনিময়ে সৌদি আরব ওই বাহিনীগুলোকে বিমান সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইয়েমেনের সংঘাতে দুই উপসাগরীয় দেশের সহযোগিতা নতুন রূপ পেতে পারে। তবে সৌদি আরব ও আমিরাতের সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টিকে আপাতত সংবাদমাধ্যমের সূত্রভিত্তিক প্রতিবেদন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের সংঘাতে সৌদি আরব ও আমিরাত একই পক্ষকে সমর্থন করলেও দেশ দুটির লক্ষ্য সব সময় এক ছিল না। উভয় দেশই হুতিদের মোকাবিলায় ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। তবে দক্ষিণ ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। আমিরাত দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন করেছিল। অন্যদিকে, সৌদি আরব ইয়েমেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং নিজের দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসেছে।

এই মতবিরোধ চলতি বছরের জানুয়ারিতে আরও গভীর হয়। দক্ষিণ ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত একটি বাহিনীর সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত পক্ষের সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের সামরিক পদক্ষেপে আমিরাত-সমর্থিত বাহিনী পরাজিত হওয়ার পর আবুধাবি ইয়েমেনে নিজের সম্পৃক্ততা কমিয়ে দেয়। এর ফলে হুতিবিরোধী বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের সমস্যা আরও প্রকট হয়। এখন হুতিদের নতুন অগ্রযাত্রা সৌদি আরব ও আমিরাতকে আবারও সহযোগিতার পথ খুঁজতে উৎসাহিত করছে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

ইয়েমেনের সংঘাতে হুতিরা একটি শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক পক্ষ। তারা দেশটির রাজধানী সানা-সহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণাঞ্চলের এডেন থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং বিভিন্ন স্থানীয় বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল। এসব বাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক লক্ষ্য, নেতৃত্ব ও সামরিক কৌশল নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হুতিদের অগ্রযাত্রা এবং লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাদের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আমিরাতের অর্থায়ন এবং সৌদি আরবের বিমান সহায়তার সম্ভাব্য সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ ইয়েমেনের জায়ান্ট ব্রিগেডস নামে পরিচিত বাহিনী নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অতীতে আমিরাত এই বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন দিয়েছিল। বাহিনীটি হুতিবিরোধী সামরিক জোটের অন্যতম কার্যকর অংশ হিসেবে পরিচিত। নতুন করে অর্থায়ন শুরু হলে তাদের জনবল, সরঞ্জাম ও অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে অর্থায়ন কখন শুরু হবে, কত অর্থ দেওয়া হবে এবং কোন এলাকায় বাহিনী মোতায়েন করা হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

সৌদি আরবের জন্য এই সহযোগিতার গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ হুতিদের হামলা এখন শুধু ইয়েমেনের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি রাজধানী রিয়াদ, বিমানবন্দর এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে। রয়টার্সের ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় আরও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে। এসব হামলা দেশটির নিরাপত্তা, বিমান চলাচল, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। সৌদি আরবের অর্থনীতি তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত দেশটির উন্নয়ন পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থানও এই সংঘাতকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দেশটির উপকূলের কাছে রয়েছে বাব আল-মানদেব প্রণালি, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ পথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। ফলে সৌদি আরব ও আমিরাতের সম্ভাব্য সহযোগিতা শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বিশ্ববাণিজ্যেও পড়তে পারে।

তবে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়লেও দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধ সহজে মিটবে না। দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল স্বাধীন দক্ষিণ ইয়েমেন প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে চায়। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা না হলে হুতিবিরোধী বাহিনীগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা কঠিন হতে পারে। সামরিক সহযোগিতা বাড়লেও রাজনৈতিক বিরোধ থেকে গেলে যুদ্ধক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন অনিশ্চিত থাকবে।

ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জন্যও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের সংঘাতে দেশটির বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে ভুগছে। নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে আরও মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হতে পারে। একই সঙ্গে বন্দর, সড়ক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে। জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান এবং মানবিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে।

হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব ও আমিরাতের নতুন সহযোগিতার খবর ইয়েমেনের সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমিরাতের অর্থায়ন এবং সৌদি আরবের সম্ভাব্য বিমান সহায়তা বাস্তবায়িত হলে হুতিবিরোধী বাহিনীগুলোর সামরিক সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, সমঝোতার শর্ত এবং মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া জরুরি। একই সঙ্গে দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিরোধ এবং সাধারণ মানুষের মানবিক সংকটের সমাধান ছাড়া শুধু সামরিক পদক্ষেপে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।

ট্যাগ: ইয়েমেনসৌদিআরবআমিরাতহুতিমধ্যপ্রাচ্য

প্রতিবেদক

Desk Report

Reporter

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সংবাদ পান আপনার ইনবক্সে

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।