ইউক্রেনকে ঘিরে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান, ন্যাটোর সহায়তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ইউক্রেনকে ঘিরে ওয়াশিংটনের নীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ইউরোপের ওপর বাড়ছে যুদ্ধের চাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে ইউক্রেনের সম্পর্ক নতুন করে টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ এবং কৌশলগত যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কিয়েভ ও তার পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোকে ইউক্রেনকে সব ধরনের সহায়তা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কিংবা তা না মানলে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো ছেড়ে দেবে এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে বিরোধের অন্যতম কারণ রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এসব হামলা বন্ধ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা এবং রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা পাওয়ার বিষয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
১৩ অক্টোবর কিয়েভে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেন, পশ্চিমা অংশীদারদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত আগাম সতর্কতা পাওয়া যায়নি। হামলায় আবাসিক ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিয়েভে একটি বহুতল ভবনে হামলায় দুজন নিহত এবং ২১ জন আহত হন।
এই ঘটনা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা এবং গোয়েন্দা সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেনের জন্য আগাম সতর্কতা, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সহায়তা অনিয়মিত হলে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৩ অক্টোবর সাংবাদিকদের বলেন, তাঁর দেশ ইউক্রেনকে সহায়তা করছে এবং গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরও বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে কাজ করে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর চেষ্টা চলছে। ফলে ওয়াশিংটন সব ধরনের সহায়তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো স্পষ্ট প্রমাণ নেই।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রকাশ করেছে প্রতিরক্ষা খাতের সংবাদমাধ্যম ডিফেন্স নিউজ। ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, কিয়েভের কর্মকর্তারা কয়েক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগের মতো নিয়মিত না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অবশ্য সব ধরনের গোয়েন্দা সহায়তা বন্ধের দাবি অস্বীকার করা হয়েছে।
স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত স্টারলিংক ও সামরিক যোগাযোগসংশ্লিষ্ট স্টারশিল্ড ব্যবস্থার ওপর বিধিনিষেধ এবং কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ, চালকবিহীন আকাশযান পরিচালনা এবং সামরিক সমন্বয় করা হয়। ফলে সেবা সীমিত হলে ইউক্রেনের কিছু সামরিক অভিযানে বাস্তব সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এ ধরনের নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতাকে সব ধরনের মার্কিন সহায়তা বন্ধের সমতুল্য বলা যায় না।
এদিকে, ইউক্রেনকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে ন্যাটোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ রয়েছে। ন্যাটোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলো অগ্রাধিকারভিত্তিক ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা চাহিদা পূরণ কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কিনে ইউক্রেনকে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই কর্মসূচিতে ছয়শ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি সামরিক সরঞ্জামের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
১২ অক্টোবর ন্যাটোর এক প্রতিনিধি জানান, ওই কর্মসূচির মাধ্যমে ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে দেওয়া সব সামরিক সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে—এমন দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে রাজনৈতিক চাপ, সরবরাহের গতি কিংবা নির্দিষ্ট সামরিক সক্ষমতায় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে কি না, তা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইউক্রেনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের সংঘাত, অবকাঠামোর ক্ষতি, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং শীতের আগে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজন দেশটির ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। ১৬ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় জেলেনস্কি ইউক্রেনের বাজেটের ঘাটতি পূরণে নতুন করে ৭০ বিলিয়ন ইউরোর সহায়তার প্রয়োজন তুলে ধরেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
তবে অর্থের সংকট রয়েছে বলেই ইউক্রেন খুব শিগগির আত্মসমর্পণ করবে—এমন পূর্বাভাস নিশ্চিতভাবে দেওয়া যায় না। যুদ্ধের ফল নির্ভর করবে সামরিক পরিস্থিতি, অস্ত্র ও গোলাবারুদের সরবরাহ, জনবল, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক আলোচনার ওপর। কোনো দেশ আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং যুদ্ধক্ষেত্রের যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তিত হলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর ইউক্রেনকে সহায়তার চাপ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয়, অস্ত্র সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিংবা সদস্যদেশগুলোকে ইউক্রেনকে সহায়তা না করার বাধ্যতামূলক নির্দেশ দিয়েছে এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পাওয়া যায়নি।
ইউক্রেনের জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও সম্পূর্ণ মার্কিন সহায়তা বন্ধ, ন্যাটোর ঐক্য ভেঙে পড়া কিংবা ইউক্রেনের আসন্ন আত্মসমর্পণের দাবি এখনই প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। বরং গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা, স্যাটেলাইট যোগাযোগের সমস্যা, সামরিক সরঞ্জামের প্রাপ্যতা এবং ইউরোপীয় সহায়তার পরিমাণের দিকে নজর রাখাই হবে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।





